উচ্চ আওয়াজে গান বাজনা নিষিদ্ধ: ‘অপরাধ’ করে বসলেন কাউন্সিলর!

শরীফ মুহাম্মদ ।।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে কাউন্সিলর শাহজালাল বাদল বিপদে পড়ে গেছেন। তার অপরাধ, তিনি তার এলাকায় ডিজে পার্টিসহ উচ্চস্বরে গান-বাদ্য করে নাগরিকদের পেরেশান ও বিড়ম্বিত করার আয়োজন নিষিদ্ধ করতে উদ্যোগ নিয়েছেন। এজন্য প্রগতিশীল ও প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো তার পেছনে লেগে গেছে। কোন ক্ষমতায় কেন তিনি গান-বাদ্য নিষিদ্ধ করলেন, এ নিয়ে ‘বিরক্তি ও ক্ষুব্ধতা’ প্রকাশ করে নানা রকম শিরোনামে রিপোর্ট করেছে।

জানা গেছে, গত শুক্রবার (১ ফেব্রুয়ারি) উচ্চস্বরে গানবাজনায় বাধা দিতে গেলে বরচসা ও উত্তেজনার মুখে ওই এলাকায় একজন মসজিদ সেক্রেটারি প্রবীণ নাগরিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। এতে এলাকাবাসীর মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এলাকাজুড়ে উচ্চ আওয়াজে গঠিত হয় গান-বাদ্যের বিরুদ্ধে জনমত। এরই প্রেক্ষিতে কাউন্সিলর শাহজালাল এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগামীকাল জুমাবার (৫ ফেব্রুয়ারি) এ ঘোষণা এলাকার সব মসজিদে এবং বাড়িওয়ালাদের জানানোর জন্য জানিয়ে দেওয়া হয়।

কারণ যত মানবিকই হোক, কারণ যত নাগরিক শৃংখলাবান্ধবই হোক, যেহেতু একজন কাউন্সিলর গান-বাজনার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমাদের প্রভাবশালী প্রগতিশীল গণমাধ্যম হঠাৎ করেই যেন ‘ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে শরিয়া আইন জারি করা’ জনিত আতঙ্কের মতো মুষড়ে পড়েছে। মুসলিম কোনো দেশে প্রকাশ্য পাপাচার বিরোধী ইসলাম সমর্থিত কোনো অনুশাসন লঘু পর্যায়ে বাস্তবায়িত হলেও পশ্চিমের রাষ্ট্র, চিন্তাকেন্দ্র ও গণমাধ্যমগুলো যেভাবে চোখ কপালে উঠিয়ে নেয়, আমাদের ‘দাপুটে’ মিডিয়াগুলো সেই কপাল কুঁচকানো থেকে পিছিয়ে থাকার লোভ সামলাতে পারেনি। বালিতে রোদের তাপ কিছু তো পড়বেই!

বিবদমান বেশ কয়েকটি করপোরেট হাউজের মালিকানাধীন নিউজ পোর্টাল ও সংবাদপত্রের পরিবেশনা দেখলাম। সিদ্ধিরগঞ্জের কাউন্সিলর শাহজালালের এই সিদ্ধান্তকে প্রায় সবাই বাঁকা চোখে দেখা ও দেখানোর চেষ্টা করেছে। শিরোনামের শব্দাবলীর মধ্যেই শুরু করেছে গুঁতা-খোঁচা। এরপর পুরো রিপোর্টে এই খোঁচাখুঁচির রেশ বজায় রেখেছে। একটি শিরোনাম- ‘সিদ্ধিরগঞ্জে গানবাজনা নিষিদ্ধ করলেন কাউন্সিলর শাহজালাল বাদল’। আরেকটি শিরোনাম-‘গান-বাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করলেন কাউন্সিলর।’

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘আগামী শনিবার (৬ ফেব্রুয়ারি) থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। গত সোমবার কাউন্সিলর শাহজালাল বাদলের অফিসে আয়োজিত সভায় এ–সংক্রান্ত তার একটি বক্তৃতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।’

খবরে আক্রোশ কিংবা মজা বাড়ানোর জন্য আরও বলা হয়েছে, কাউন্সিলর শাহজালাল বাদল সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও আলোচিত সাত খুন মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নূর হোসেনের ভাতিজা।

‘কাউন্সিলর শাহজালাল বাদলের উপস্থিতিতে তাঁর নির্দেশে এক ব্যক্তি উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, ‘এই এলাকায় গানবাজনা নিষিদ্ধ। এই মুসলমান সমাজে যাতে আর কোনো গানবাজনা না হয়, এ জন্য কাউন্সিলর অফিস থেকে প্রত্যেক মসজিদ কমিটি ও পঞ্চায়েত কমিটি বরাবর চিঠি ইস্যু করা হবে। আগামী শুক্রবার জুম্মার নামাজের বয়ানে বলে দেওয়া হবে। আগামী শনিবার থেকে গানবাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেই চিঠির রেফারেন্স নিয়ে প্রতিটি বাড়িওয়ালাকে আপনারা বলে দেবেন।’

‘চেতনাবাদী’ মিডিয়া হাউজের সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে কাউন্সিলর কী বলেন দেখুন।

‘কাউন্সিলর শাহজালাল বাদল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডিজে পার্টির নামে রাতে এলাকায় উচ্ছৃঙ্খল যুবকেরা বিভিন্ন দিবসে গানবাজনা করার কারণে মানুষের ক্ষতি হচ্ছে। রাতে এই ডিজে পার্টির কারণে বাগ্‌বিতণ্ডা থেকে কয়েক দিন আগে নূরবাগ এলাকার মসজিদের সাধারণ সম্পাদক আবদুস সাত্তার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এ কারণে আমরা সবাই মিলে গানবাজনা বন্ধ রাখার বিষয়ে সভা থেকে একমত হয়েছি। ওই সভায় পঞ্চায়েত ও মসজিদ কমিটি সমর্থন জানিয়েছে। এ বিষয়ে আরও দুটি সভা হবে। পরবর্তী থানার ওসির সঙ্গে আলাপ করা হবে। সামাজিক ও ভালো কাজের জন্য যেখানে এলাকার পঞ্চায়েত কমিটির সমর্থন আছে, সেখানে অবশ্যই প্রশাসনও সহযোগিতা করবে।’

এখানে উল্লেখ করা দরকার, এই কাউন্সিলর শাহজালাল নারায়ণগঞ্জের আলোচিত নূর হোসেনের ভাতিজা কিনা সেই পরিচয় এখানে মুখ্য ছিল না। তারপরও তার সেই পরিচিত এখানে টেনে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখার মতো বিষয় যে, এসব ভেকধরা প্রগতিবাদী মিডিয়া ওয়াজ মাহফিল এর আওয়াজ ও মাইকে শব্দ দূষণের ব্যাপক উপাদান খুঁজে পেলেও ডিজে পার্টিসহ উচ্চ আওয়াজে গান-বাদ্য বন্ধ করা নিয়ে তাদের মন খারাপের শেষ নেই। এই গানবাজনায় যেন শব্দ দূষণের কোনো ব্যাপারই নেই! এজন্য কাউন্সিলর শাহজালাল বাদলের গান-বাদ্য বিরোধী এই পদক্ষেপকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখেনি তারা।

তাদের রিপোর্টের ভাষা ‘এ সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক শাহীন মাহমুদ …আলোকে বলেন, ‘যেকোনো সংস্কৃতিই হোক, সেটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। মানুষের আচার–আচরণের ওপর সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল, তা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। যখনই চাপিয়ে দেওয়ার কোনো ব্যাপার থাকে বা চেষ্টা করা হয়, তখনই বুঝতে হবে কারও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের ব্যাপার রয়েছে। চাপিয়ে দেওয়া ব্যাপার শেষ পর্যন্ত টেকে না। গানবাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের ব্যাপারে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি…।’

কাউন্সিলর বাদল অপরাধ তো ছোটখাটো করেননি, গান-বাদ্যের আহবায়কদের মাথা নষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি যদি তার এলাকায় নাচের দশটা পার্টি করতেন, ‘কোমল’ মদের আসর আর চেতনাবাদী ফুর্তির মজমা বসানোর নোটিশ জারি করতেন তাহলে এসব মিডিয়া ও সংস্কৃতিবিদদের ভালো লাগা বেড়ে যেত। তারা আর সিদ্ধিরগঞ্জ থানা ওয়ালাদের কাছে যেতেন না। কিন্তু এবার থানার ওসির বক্তব্যও কাউন্সিলরকে গুঁতো দিয়ে নেওয়া হলো।

খবরে বলা হলো আরো ‘সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মশিউর রহমান প্রথম…কে জানান, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তো গানবাজনা নিষিদ্ধ করা হয়নি। উনি (শাহজালাল বাদল) গানবাজনা নিষিদ্ধ করার কে? এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রিয় পাঠক, এদেশে ওয়াজ মাহফিল করতে অনুমতি লাগে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছে কি হয়নি, এটা জিজ্ঞেস করারও ফুরসৎ পাওয়া যায় না। থানার অনুমতি ছাড়া মাহফিল করা নিষেধ প্রায়। সেই জায়গায় একজন ওসি বলছেন, ‘গান-বাজনা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তো নিষিদ্ধ করা হয়নি উনি নিষিদ্ধ করার কে’? এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নানা মাত্রিক এলার্জি থাকলেও, গান-বাদ্যের রমরমা আয়োজনের পক্ষে আপনি মিডিয়া-সংস্কৃতি, প্রশাসন- সবাইকে একজোট পাচ্ছেন। এ থেকে এটা বোঝা সহজ যে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ড (সিদ্ধিরগঞ্জ)-এর কাউন্সিলরের অপরাধ আসলেই ছোট নয়! শব্দ দূষণ বলুন, নাগরিকদের শান্তি ভঙ্গ করা বলুন, আর নীতি-নৈতিকতা ধ্বংসের কথাই বলুন, ওয়াজ-মাহফিলের বিরুদ্ধে না গিয়ে গানবাদ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেলেন, এত বড় দুঃসাহস! কিংবা এত বড় বোকামি!! এর খেসারত তো তাকে দিতেই হবে!!!

-এসএন