বাইডেনকে প্রাক্তন গুয়ান্তনামো বন্দীদের খোলা চিঠি

মানসুর আদাইফি, মুয়াজেজম বেগ, লাখদার বোমেডিয়েন্স, সামি আল হাজ্ব, আহমেদ  ইরেচিডি ।।

আমরা গুয়ান্তানামোবের বিনা বিচারে আটক প্রাক্তন কয়েকজন বন্দী। প্রেসিডেন্ট হিসাবে আমরা আপনাকে কিছু বলতে চাই। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইতিপূর্বে বইও লিখেছি।

প্রথমত, আমরা আপনার পূর্বসূরীর দ্বারা গৃহীত অনেকগুলি অবিচার এবং সমস্যাযুক্ত সিদ্ধান্তের বিপরীতে আপনার নির্বাহী আদেশকে স্বাগত জানাই। আমরা আপনার “মুসলিম নিষেধাজ্ঞা” বাতিল করার প্রশংসা করি।

মুসলিম নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ কিছু ইতিবাচক ঘটনাবলি সত্ত্বেও, এখনও যুক্তরাষ্ট্রে গভীর ত্রুটিযুক্ত এবং অন্যায় একটি ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে, যা দুই দশককাল ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচজন রাষ্ট্রপতি অতিবাহিত হওয়ার পরও টিকে আছে।তা হল গুয়ান্তানামো বে কারাগার। গুয়ান্তানামো বে উনিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান এবং একচেটিয়াভাবে মুসলিম পুরুষদের জন্য নির্মিত হয়েছিল।

আমরা বুঝতে পারি যে আপনার বিশ্বাস আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার বিশ্বাস আপনাকে সামাজিক ন্যায়বিচারের দিকে পরিচালিত করতে সহায়তা করে। আমাদের কারাগারে থাকাকালীন, আমরা প্রায়শই কুরআনে হযরত জোসেফ (ইউসুফ) এর কাহিনী এবং তাঁর বহু বছরের ভুল কারাবাস নিয়ে চিন্তা করেছি। এটি বাইবেলেও আছে। এবং এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ন্যায়বিচার কেবল মহান কাজই নয়, কালজয়ী। এজন্য আমরা আপনাকে লিখছি।

যদিও আমাদের বেশিরভাগই প্রেসিডেন্ট বুশের অধীনে মুক্তি পেয়েছিলেন, সকলেই আশাবাদী ছিলেন, যে রাষ্ট্রপতি ওবামা ২০০৯ সালে গুয়ান্তানামো বন্ধ করার বিষয়ে তাঁর কার্যনির্বাহী আদেশটি মেনে চলবেন। যদিও আমাদের মধ্যে কয়েকজন ওবামার অধীনে মুক্তি পেয়েছিলেন, তবে তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সময় এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত তিনি গুয়ান্তানামো  কারাগার বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবেন না।

আমাদের অনেককে আমাদের বাসা থেকে, আমাদের পরিবারের সামনে থেকে  অপহরণ করা হয়েছিল এবং  সমান্য অনুগ্রহ লাভের আশায় আমাদেরকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। গুয়ান্তানামো পৌঁছার আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্য ভোগ করার পাশাপাশি আমাদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল।

আমাদের কারও কারও বাচ্চা ছিল যারা আমাদের অনুপস্থিতিতে জন্মগ্রহণ করেছিল এবং পিতৃবিহীন বেড়ে উঠেছিল। অন্যরা এই বেদনা নিয়ে দিন গুজরান করেছিল যে একদিন আমাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা আমাদের কাছে ফিরে আসবেন।

গুয়ান্তানামোতে বর্তমানে আটককৃত বেশিরভাগ বন্দী কখনও যুক্তরাষ্ট্রে আসেনি। এর অর্থ হ’ল আমাদের বুকে আপনার দেশের সে চিত্রটি আমরা ধারণ করেছি যা আমরা গুয়ান্তনামোতে দেখেছি। অন্য শব্দে আমরা শুধু আমেরিকার কালো অধ্যায়টিই দেখেছি।

রাষ্ট্রপতি বুশ এটি খুলেছেন। রাষ্ট্রপতি ওবামা এটি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প এটি উন্মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন আপনার পালা, বিশ্ব দেখবে আপনি কি করবেন।

আপনার উদ্বোধনকালে, আপনি বিশ্বকে বলেছিলেন: “আমরা বর্তমানের সংকটগুলোকে কিভাবে কাটিয়ে উঠি সে আলোকেই আমাদের বিচার করা হবে।” সুতরাং গুয়ান্তানামো বন্ধ করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেয়ার জন্য আপনার প্রতি আমাদের পরামর্শ:

১. যাদেরকে মুক্তির কথা বলা হয়েছে, তাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের স্বদেশে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।

২. যারা  বাড়িতে ফিরে যেতে পারছেন না তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করার জন্য বিশেষ দূতাবাস খোলা হোক।

৩. প্রাক্তন কারাবন্দীরা যাতে নতুন দেশে অর্থবহ জীবন শুরু করতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

৪. “চিরকাল বন্দী” করে রাখার ধারণাটি প্রত্যাহার করা হোক। সামরিক কমিশনের অধীনে যারা অভিযোগ থেকে মুক্ত তাদের উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করে প্রত্যাবাসন বা পুনর্বাসিত করা হোক।

৫. প্রত্যাবাসন / পুনর্বাসন জোর করে করা উচিত নয়্। বন্দীদের সেখানে পুনর্বাসিত করা যাবে না যেখানে তারা আবারও নির্বিচারে কারাবাসের মুখোমুখি হবে।

ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে আপনার আমলে আমেরিকা গুয়ানতানামো থেকে সিনিয়র তালিবান নেতাদের মুক্তি দিয়েছে। আজ, তারা আফগানিস্তানে শান্তি আনতে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আপনার উদ্বোধনী ভাষণের সময় আপনি বলেছিলেন, “প্রতিটি মতবিরোধ যুদ্ধের কারণ হতে দেয়া উচিত না।” আমরা একমত, যেমনটি ওবামা একবার বলেছিলেন, গুয়ান্তানামো কখনই খোলা উচিত ছিল না। আমরা বিশ্বাস করি, আপনি বিশতম বার্ষিকীর পূর্বেই গুয়ান্তানামো বন্ধ করতে পারবেন।

অনুবাদ ও সংক্ষেপন : এনাম হাসান জুনাইদ ।।

 নিউ ইয়র্ক রিভিউ/ ইজে