এমবিএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে নিষেধাজ্ঞা বিল, জার্মানিতে আন্তর্জাতিক আইনে তদন্তের আবেদন

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: পাপ ছাড়ে না বাপকেও। সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার ঘটনায় দায়ী সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কোনঠাসা হওয়ার পথে।

মঙ্গলবার তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে  একটি বিল উত্থাপন করেছেন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য ইলহান ওমর। এতে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সঙ্গে প্রগতিশীল আইনপ্রণেতাদের একটি বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালকের অফিস থেকে প্রকাশ করা প্রতিবেদনে খাশোগি হত্যায় এমবিএস নামে পরিচিত যুবরাজকে দায়ী করা হয়েছে।-খবর আলজাজিরা ও হিলের।

প্রতিনিধি পরিষদের মিনেসোটা থেকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সদস্য ইলহান বলেন, এটা আমাদের মানবতার পরীক্ষা। যদি আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র সত্যিকারের বাকস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে সমর্থন করে, তা হলে মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ না-করার কোনো কারণ থাকতে পারে না— যেখানে আমাদের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমবিএস হত্যায় অনুমোদন দিয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার এই বিলের কারণে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি বিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কারণ এমবিএসকে শাস্তি দিতে অস্বীকার জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসন।

সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নেড প্রাইস বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের কোনো ভাঙন সৃষ্টি করতে চায় না।

এমবিএসের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করতে বাইডেন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি বলেন, মার্কিন-সৌদি সম্পর্ককে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে আমরা কাজ করছি।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে ন্যান্সি পেলোসি বলেন, এমবিএসসহ সৌদি কর্মকর্তাদের নির্দেশে জামাল খাশোগিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে—বিশ্ব যা আগে থেকেই জানত। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তা আরও নিশ্চিত করেছে।

কিন্তু তার বক্তব্য থেকেও সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের আহ্বানের প্রতিধ্বনি এসেছে। তিনি বলেন, খাশোগির স্মৃতিকে স্মরণ করে একটি আইন প্রণয়ন করবে হাউস।

খাশোগির বাগদত্তা খাদিজা চেঙ্গিসের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে ইলহান ওমর বলেন, যদি যুবরাজকে শাস্তি দেওয়া না হয়; তবে হত্যার মূল অপরাধীও নাজাত পেতে পারে বলে চিরদিনের জন্য একটি নজির হয়ে থাকবে।

তিনি বলেন, যুবরাজ যতক্ষণ পর্যন্ত সাজা থেকে রেহাই পেয়ে যাবেন; ততক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, মানবাধিকার ও সৌদি ভিন্নমতাবলম্বীদের স্বার্থ ঝুঁকিতে থাকবে।

বিলটিতে বলা হয়েছে, এমবিএসের বিরুদ্ধে অবশ্যই নিষেধাজ্ঞা আরোপ কিংবা তার সম্পদ জব্দ করতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট যুবরাজের সব লেনদেন নিষিদ্ধ করে দিতে হবে।

জার্মানির আদালতে আন্তর্জাতিক আইনে তদন্তের আবেদন

এদিকে একই ঘটনায় বিন সালমানের মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করতে জার্মানির আদালতে আবেদন করেছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স।

জার্মানির আন্তর্জাতিক বিচার আইনের অধীন ফৌজদারি মামলায় এই তদন্ত চাওয়া হয়েছে। এতে খাশোগিসহ আরও কয়েক ডজন সাংবাদিকের ওপর পরিকল্পিত নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে। খবর এএফপি।

২০১৮ সালের ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে যুবরাজের গুপ্তচরদের হাতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন খাশোগি। তিনি মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট ছিলেন।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে খাশোগি হত্যায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে দায়ী করা হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবেদনের নিন্দা জানিয়ে দুর্বৃত্তদের অভিযানে তিনি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে।

কিন্তু রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স জানিয়েছে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও তাদের নীরব করিয়ে দিতে রাষ্ট্রীয় নীতির সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। সোমবার জার্মানির কার্লশ্রুসে কেন্দ্রীয় বিচার আদালতে এ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরবে কারাদণ্ড দেওয়া রাইফ বাদউইসহ ৩৪ সাংবাদিকের বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে রয়েছে। ইসলাম অবমাননার অভিযোগে ২০১২ সাল থেকে তাকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে।

এক বিবৃতিতে আরএসএফের মহাসচিব ক্রিস্টোফি ডেলওয়ার বলেন, এ ঘ্টনায় একটি অবস্থান নিতে আমরা জার্মানির কৌঁসুলিদের আহ্বান জানিয়েছি। কেউ-ই আন্তর্জাতিক আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না—বিশেষ করে যখন মানবাধিকারের প্রশ্নটি সামনে চলে আসে।

কার্লশ্রুসের আদালত এই অভিযোগ গ্রহণের বিষয়ে বার্তা সংস্থা এএফপিকে নিশ্চিত করেছে। কিন্তু এ নিয়ে অতিরিক্ত কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার জানিয়েছে।

৫৯ বছর বয়সী খাশোগিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে তার শরীর কেটে টুকরো টুকরো করে তা রাসায়নিক দিয়ে গলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে গুপ্তচরদের ১৫ জনের একটি স্কোয়াড অংশ নেয়।

এই হত্যায় পশ্চিমা বিশ্বে এমবিএস নামে পরিচিত যুবরাজকে সরাসরি দায়ী করে প্রতিবেদন দিয়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতিসংঘের একজন বিশেষ দূত।