লাভ চাইল্ড: শব্দের ডিগবাজি

শরীফ মুহাম্মদ।।

শব্দ দিয়ে তেতোকে মিষ্টি বানানোর চেষ্টাটা আগে থেকেই চালু ছিল। অনেক সময় ভাবের উল্টো শব্দ ব্যবহার করে পরিস্থিতি ও মনোভাবে পক্ষ-বিপক্ষের অর্থ তৈরি করা হয়। সাধারণ সমাজ কিংবা জীবনযাপনের ক্ষেত্রে এ জাতীয় বিপরীত শব্দ প্রয়োগ তেমন সংকট বয়ে আনে না হয়তো, কিন্তু আদর্শিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে বড় জটিলতা তৈরি করে।

লাভ চাইল্ড। মাস কয়েক আগে এই শব্দটি প্রথম চোখে পড়ে। চোখে পড়ার পর থেকেই কাঁটার মতো শব্দটা বিঁধতে শুরু করেছে। ভালোবাসার শিশু! প্রেমের জাতক! স্বাভাবিকভাবে শব্দটা কত কোমল, কত মায়াময়, কতই না সমর্থনযোগ্য। অথচ এই শব্দটা ব্যবহার করা হয় অবৈধ প্রণয়জাত সন্তানের ক্ষেত্রে। বিবাহ বহির্ভূত নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যে সন্তানের জন্ম হয় পশ্চিমের দেশ ও সমাজে সেই সন্তানকেই ‘লাভ চাইল্ড’ বলে। বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বিবাহপূর্ব লাভচাইল্ড (জারজ সন্তান) বিষয়ক খবর দেখে এই শব্দের সঙ্গে প্রথম ধাক্কা খাওয়া পরিচয়টা ঘটে। পরে দেখলাম, পশ্চিমের মিডিয়া এই শব্দটাকে আরো ব্যাপক ও জনপ্রিয় করে তোলার মিশনই হাতে তুলে নিয়েছে।

অবৈধ সম্পর্কজাত সন্তান আমাদের সমাজে জারজ সন্তান হিসেবে পরিচিত। যদিও এমন সন্তান হওয়ার ভাগ্যবরণের ক্ষেত্রে সন্তানের কোনো দায়-দোষ নেই, তবুও শিশুর জন্ম প্রক্রিয়ার অনৈতিকতার বিষয়টি স্পষ্ট করতে এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে নারী-পুরুষের সম্পর্কের নৈতিকতা ও অনৈতিকতা, বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক ও সম্পর্কের ভিত্তিতে সন্তানের জন্ম হওয়া কোনো ব্যাপারই না। বরং তাদের কাছে, তাদের মূল্যবোধের চোখে এজাতীয় সম্পর্কজাত সন্তান যেন আরও গর্বের, যেন পরিচয়ের ক্ষেত্রে আরো জৌলুস ও সম্মানের! এজন্য তারা স্বাভাবিক বৈবাহিক সম্পর্কজাত সন্তানের ক্ষেত্রে এত আবেগময় কোনো পরিচিতিমূলক শব্দ ব্যবহার না করলেও বিবাহ বহির্ভূত সন্তানের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর এই ‘মায়াময়’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। আজ এই শব্দটি আবার দেখলাম। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ক্ষেত্রে। একটি মেয়েকে তার ‘লাভ চাইল্ড’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে গণমাধ্যমে।

যৌনজীবন ও দাম্পত্যের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর মূল্যবোধ যেমন পথচ্যুত, তেমনি তাদের রাষ্ট্রনায়কদের জীবনও ফস্টি-নস্টিতে টালমাটাল। বরিস জনসন, ভ্লাদিমির পুতিন, ইমানুয়েল ম্যাক্রো-এইসব রথী-মহারথীদের জীবনের দিকে তাকান! অদ্ভুত লাভ এবং লাভ চাইল্ডের এক ভোগপ্রবন বন্য জীবনের সন্ধান পাবেন। তাদের কাছে স্বাভাবিক বৈবাহিক সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের সূত্রে জন্ম হওয়া সন্তান একটা পানসে ফ্যাকাশে ব্যাপার! বাধ-বন্ধনহীন পশুময় উন্মাতাল জীবনের ঘ্রাণ তাদের জীবনে নিয়ে আসে থ্রিল ও ‘লাভ’। সেখান থেকে লাভ চাইল্ড।

এ যেন সভ্য মানুষের ধীরে ধীরে আদিমতার দিকে ফিরে যাওয়ার এক শব্দময় মহড়া। অথবা নির্দোষ কোমল শব্দের আদিম দুর্গন্ধ যাত্রা। এবং সেই আদিমতাকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে বরণ করা। মলকে হালুয়া জ্ঞান করার এই আদিম সভ্যতা এবং আদিমতা কেন্দ্রিক এই শব্দের ডিগবাজি সুস্থ মানুষের মগজ- কোষে বড় একটা জায়গা পাওয়ার কথা না। বিকৃত বিচ্যুত মানুষদের কথা তো ভিন্নই।

-এনটি

পূর্ববর্তি সংবাদকরোনা পরিস্থিতিতে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সীমিত পরিসরে মন্ত্রিসভা বৈঠক
পরবর্তি সংবাদওয়াজিরিস্তানে সেনা অভিযানে তালেবানের ২ শীর্ষ কমান্ডার নিহত