করোনার ভ্যাকসিন: শরঈ দৃষ্টিকোণ

মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানী ।।

রোগ এবং নিরাময় দুটোই আল্লাহর পক্ষ থেকে। মানুষ যদি আখেরাতের চিন্তার সঙ্গে এগুলোর সম্মুখীন হয় তবে উভয়ই আল্লাহর নেয়ামত। একজন ঈমানদার মানুষ অসুস্থ হলে ধৈর্যধারণ করে। আর ধৈর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। এমনকি কোরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে,

إن اللہ مع الصابرین

“আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন” (বাক্বারাহ ২: ১)

মুমিন যদি অসুস্থতার চিকিৎসা করে তবে সে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি সুন্নতের ওপর আমল করল। আর যে কোন আমল যদি সুন্নাত অনুসরণের নিয়ত করে হয় তবে তা সওয়াবের কারণ। যদি আল্লাহ তাআলা শিফা নসিব করেন তাহলে বান্দা তার মালিকের শোকর আদায় করবে। আর শোকরও ধৈর্যের সমপর্যায়ের।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, এক ব্যক্তি রোযা রাখল এবং ক্ষুধা-পিপাসায় ধৈর্যধারণ করল, আরেক ব্যক্তি পানাহার করল এবং আল্লাহর শোকর আদায় করল, উভয়ের আমল আল্লাহর নিকট প্রিয়। রোযা রাখা এবং ক্ষুধা ও পিপাসায় ধৈর্য ধারণ করা, খাওয়া পান করা এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উভয়ই মূল্যবান কাজ। হাদীসের ভাষ্য: الطاعم الشاکر کالصائم الصابر (সুনানে দারেমী, হাদিস ২০৬৭)

রোগ-ওষুধ দুটোই আল্লাহর সৃষ্টি

ইসলামের আগে কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের বিশ্বাস অনুসারে আল্লাহর নৈকট্যের জন্য সন্ন্যাসবাদের পথ অবলম্বন করেছিল। কিছু লোক গোসল করত না, কিছু লোক সুগন্ধি ব্যবহার করত না, কিছু লোক কাঁটাঝোপে শুয়ে নিজেকে রক্তাক্ত করত এবং কিছু মানুষ ক্ষুধা ও পিপাসায় কৃচ্ছ্বসাধন করত, কিছু লোক পোশাকহীন খালিদেহ হয়ে থাকত। এমনকি ইউরোপের গির্জার ধর্মীয় নেতারা রোগের চিকিৎসা করাকে ধর্মহীনতা বলে অভিহিত করেছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, আল্লাহর আদেশে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই রোগের চিকিৎসা করা হলে ইশ্বরের ইচ্ছাতে হস্তক্ষেপ করা হবে।  পক্ষান্তরে ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম।  ইসলাম সন্নাস ও বৈরাগ্যকে নিষিদ্ধ করেছে। (শরহুস সুন্নাহ লিলবাগাবী, হাদিস ৪৮৪, মসজিদে নামাযের অপেক্ষায় বসে থাকা- অধ্যায়) এমনিভাবে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রোগও আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন, এবং তার ওষুধও আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। অতএব চিকিৎসা করো। (তাবারানী, আলমুজামুল কাবীর: ২৪/২৫৪)

করোনার ভ্যাকসিন চিকিৎসার কোন্ পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত?

চিকিৎসার এক পদ্ধতি হলো অসুস্থ হলে ওষুধ সেবন করা, অন্যটি হলো, এখনও অসুস্থ হয়নি, তবে দেহের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, উভয় ক্ষেত্রেই রোগ নিরাময়ে বা রোগের সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে ওষুধের ব্যবহার জায়েয। তবে রোগের প্রকৃতি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব বা স্থিতিশীলতা এবং রোগ বৃদ্ধিকারী পরিবেশের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে বিধানে কিছুটা তারতম্য হতে পারে। প্রত্যেকে নির্ভরযোগ্য মুফতীর সামনে নিজের অবস্থা তুলে ধরে তাদের মতামত নিতে পারেন।  কারোনার ভ্যাকসিন মূলত চিকিৎসার দ্বিতীয় প্রকারের অন্তর্ভূক্ত। অর্থাৎ ব্যক্তি এখনও করোনার রোগে আক্রান্ত হয়নি; কিন্তু মহামারী পরিস্থিতি বিবেচনায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে ভ্যাকসিনকে গ্রহণ করে।

ওষুধের হালাল-হারাম হওয়া কীসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে?

একটি নির্দিষ্ট ওষুধের হালাল এবং হারাম হওয়ার সাথে মূলত দুটি জিনিস জড়িত, একটি হলো ওষুধের উপাদানগুলি কী কী? দ্বিতীয়: রোগীর কতক্ষণ ও কী পরিমাণ এ ওষুধ প্রয়োজন? ওষুধের উপাদানের কথা বলতে গেলে মূলত ওষুধ তিন ধরনের বস্তু থেকে তৈরি করা হয়।  প্রথমত জড়পদার্থ, যেমন: কাদামাটি,  লোহা,  চুনা, স্বর্ণ, রৌপ্য, পাথর, ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত উদ্ভিদ, অর্থাৎ জমি থেকে উৎপন্ন লতা, চারা, ফল, ফুল, গাছ এবং গাছের পাতা ও ছাল-বাকল থেকে। তৃতীয় প্রাণীর দেহ দ্বারা, অর্থাৎ পশুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, গোশত, হাড় এবং চামড়া ইত্যাদি থেকে।

উদ্ভিদ থেকে তৈরি ওষুধ

এগুলোর মধ্যে প্রথম ধরণের সব জিনিসই জায়েয। শরীয়তে এগুলির কোনটিকেই হারাম আখ্যা দেওয়া হয়নি। উদ্ভিদের মধ্যে নেশাজাতীয় লতাপাতা ছাড়া সমস্ত গাছ, চারা এবং তা থেকে উদ্গত বস্তুসমূহ হালাল। প্রাচীন কাল থেকে আজ অবধি বেশিরভাগ ওষুধ গাছপালা থেকেই তৈরি হয়ে আসছে। যদি কোনো ভ্যাকসিনে প্রথম দুই প্রকারের জিনিসের ব্যবহার হয় তাহলে সেটা স্পষ্টতই জায়েয। (যদি সেই ওষুধে মানুষের দেহ ও মানসে কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়ে।)

প্রাণির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে তৈরি ওষুধ

আসল সমস্যা হলো প্রাণিদের বিষয়ে। কিছু প্রাণি হালাল এবং কিছু হারাম। যেসব প্রাণি হালাল তারও কিছু অংশ হারাম। তেমনিভাবে শরয়ী পদ্ধতি অনুসারে পশু জবাই না করা হলে হালাল প্রাণিও হারাম এবং মৃতের হুকুমে।

এখন যদি শরয়ী পদ্ধতিতে জবাই করা হালাল প্রাণীর হালাল অঙ্গ যেমন, চামড়া, গোশত এবং হাড় থেকে ওষুধ তৈরি করা হয়,  তবে এটি জায়েয হওয়াতে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু যদি হারাম প্রাণী,  হারাম পশুর হারাম অঙ্গ অথবা শরঈ পদ্ধতি ব্যতীত জবাই করা হালাল প্রাণী দ্বারা ওষুধ তৈরি করা হয়, তবে সেটা বিবেচনা করতে হবে। এসব প্রাণি খাওয়া যেমন হারাম তেমনি এগুলো থেকে প্রক্রিয়াজাত ওষুধ খাওয়া বা রগ ও গোশতের মাধ্যমে দেহে ইনজেক্ট করাও জায়েয নেই। তবে দুটি ব্যতিক্রম অবস্থা রয়েছে:

একটি হলো যদি ওষুধগুলি ওই হারাম উপাদানগুলি দ্বারা এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে তাদের আসল রূপই বদলে যায়, তবে তার ওপর হারাম হওয়ার বিধান আর থাকবে না। কারণ, শরিয়তের বিধিবিধানের সম্পর্ক কোনো বস্তুর বিদ্যমান রূপের সাথে। যখন রূপটি বদলে যায়, তখন বিধানও পরিবর্তন হয়। আর আসল রূপের পরিবর্তন কখন ধর্তব্য হবে? এটি একটি খুব সূক্ষ্ম এবং জটিল বিষয়।

বস্তুর মূল অবস্থার পরিবর্তন কখন ধর্তব্য হবে?

ফকীহগণ এ সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেন তার সংক্ষিপ্তসার হলো, বস্তুর প্রকৃতি এবং অবস্থা তিনটি জিনিসের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। রঙ, গন্ধ এবং স্বাদ। যদি এই তিনটি জিনিস পরিবর্তিত হয় তবে এটাকে মূল অবস্থা পরিবর্তনের লক্ষণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ভারতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহী গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফিকহ একাডেমি ইন্ডিয়া এবং ইদারাতুল মাবাহিছিল ফিকহিয়্যা (জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ) মুফতীগণ এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে এই সিদ্ধান্ত করেছে।

অতএব, যদি ভ্যাকসিনে হারাম প্রাণির উপাদান থাকে এবং তাতে রাসায়নিক উপাদানগুলির মাধ্যমে এধরনের পরিবর্তন ঘটে গিয়ে থাকে, তবে তার ব্যবহার জায়েয হবে।

দ্বিতীয় ব্যতিক্রম অবস্থাটি হচ্ছে, যদি এমন হয় যে, বস্তুর প্রকৃতি এবং মূল অবস্থা পরিবর্তন হয়নি; কিন্তু বিশেষজ্ঞের চিকিৎসকদের গবেষণা অনুসারে এর ব্যবহার জরুরি, তখনও এর ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ স্বয়ং কুরআন মাজীদে জীবন বাঁচাতে হারাম জিনিসকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। (বাকারা: ১৭৩)

সারকথা

এই বিশদ আলোচনার আলোকে করোনার ভ্যাকসিনের বিষয়টিকে যদি বিবেচনা করা হয়, তবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান অনুযায়ী এতে হারাম উপাদানের অন্তর্ভুক্তি গবেষণার পর্যায়ে পৌঁছায়নি, নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এধরনের কথাবার্তা আসছে; কিন্তু কোনও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বিষয়টি নিশ্চিত করেনি এবং কেউ পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে কোনও প্রত্যয়িত প্রতিবেদনও জমা দেয়নি।

অতএব নিছক সন্দেহের ভিত্তিতে এটিকে হারাম ঘোষণা করা যায় না। বরং যুক্তরাজ্যের ভ্যাকসিনের ব্যাপারে একথাও সামনে এসেছে যে, এটিকে উদ্ভিদ থেকে তৈরি করা হয়েছে। আর যদি হারাম উপাদান ব্যবহার করা হয়েও থাকে, তাহলে সেটা তার আসল অবস্থায় বহাল আছে কিনা-এটা স্পষ্ট নয়। বরং সংবাদপত্রে এবং সামাজিকমাধ্যমে ভ্যাকসিনের যে বিবরণ সামনে আসছে যে, সেটি তরল জাতীয়- এর দ্বারা স্পষ্ট এটাই বোঝা যায় যে, এর উপাদানগুলি পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়েছে।

সুতরাং, যদি এর কারণে মানুষের জীবন বা তার কোনও শক্তি ও আচরণে বিরূপ প্রভাব না পড়ে, তবে এর ব্যবহারে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো সমস্যা নেই। আর চিকিৎসাগতভাবে কী প্রভাব পড়তে পারে-এটা কেবল চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতামত দ্বারা সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। বাকি রইল, লক্ষ লক্ষ লোকের মধ্যে যদি দু-চারজনের ভ্যাকসিন ব্যবহারের পর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, তো এটি কোনও দলিল নয়। কারণ, প্রতিনিয়ত যে ওষুধগুলি ব্যবহার করা হয়, মাঝেমধ্যে তাতেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটে এবং অনেক মৃত্যুও ঘটে যায়। তাই দোয়ার প্রতি মনোযোগ দেওয়াও আবশ্যক, যাতে  মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বারবার  ধেয়ে আসা করোনার থাবা থেকে রক্ষা করেন।  وما ذالک علی الله بعزیز  (এটা আল্লাহর জন্য কঠিন নয়।)

ভাষান্তর: সাইফ নূর

-এমএসআই

পূর্ববর্তি সংবাদকুখ্যাত সেই গুয়ান্তানামো বে কারাগার বন্ধ করতে চান বাইডেন!
পরবর্তি সংবাদসন্ত্রাসীদের হাতে অপহৃত ৫ রেহিঙ্গা মাঝি উদ্ধার