একজন হাফেজ ‘কামলা’র জীবিকার সন্ধান এবং কিছু বিনীত কথা

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ।।

আমার আব্বা গতকাল মসজিদের তালিমে বলছিলেন—

‘বছর দুয়েক আগে তাবলিগের চিল্লা দিচ্ছিলাম দিনাজপুর সদরে। শেষের যে মসজিদে ছিলাম, ওই মসজিদের ইমাম ছিলেন এক হাফেজ সাহেব। মসজিদের পাশে একটা হেফজখানাও আছে, তিনি সেখানে ছাত্রদের হেফজ পড়াতেন। বয়সে যুবক, বিয়ে করে দুটো বাচ্চাও আছে সম্ভবত। সেই হাফেজ সাহেব আমাদের খুব সমাদর করেছিলেন।

‘এটা দুই বছর আগের ঘটনা। মাসখানেক আগে আমি আমাদের বাজারে হরিপদ’র ফার্মেসিতে বসে ছিলাম। এমন সময় দেখি, লুঙ্গি-শার্টপরা দাড়িওয়ালা এক যুবক আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। চেহারাটা চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু ঠিক চিনতেও পারছি না। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে সেই যুবকই সামনে এসে সালাম দিয়ে বললেন, ‘আমাকে চিনতে পারেন নাই?’

আব্বা বললেন, ‘না, তবে চেনা চেনা লাগছে…।’

যুবক বললেন, ‘আপনি দিনাজপুরে চিল্লা দেয়ার সময় শেষ যে মসজিদে ছিলেন, আমি সেই মসজিদের ইমাম সাহেব।’

এবার আব্বা তাকে ঠিকমতো চিনতে পারলেন। তাকে হাত ধরে টেনে পাশে বসালেন। তার বেশভূষা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি এখানে কেন? আর এই বেশভূষা…?’

যুবক কষ্টের হাসি টেনে বললেন, ‘কামলা দিতে আসছি, চাচা!’

তার কথা শুনে আব্বা বিমূঢ় হয়ে গেলেন। মসজিদের একজন ইমাম এবং মাদরাসার হাফেজ সাহেব, তিনি অভাবের তাড়নায় মাদরাসা-মসজিদের সম্মানজনক চাকরি ছেড়ে দিনাজপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন কামলা খাটতে! মানুষের খেতে ধান বুনবেন বা অন্য যে কোনো কাজে দিনমজুরি করবেন! এটা আব্বা ভাবতেই পারেননি।

আব্বা তার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলেন, ওই মসজিদ-মাদরাসায় চাকরি করে বেতন সাকুল্যে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। ও দিয়ে কোনোভাবেই সংসারের ব্যয় গুজরান হয় না। অথচ এ এলাকায় কামলা দিলে দিনপ্রতি আড়াইশো থেকে তিনশো টাকা পাওয়া যায়। তাতে মাসশেষে আট-নয় হাজার টাকা হাতে আসে। ‘সম্মানজনক’ চাকরি করে যদি সংসারই না চলে, তার চেয়ে দিনমজুরি করে সংসারের অভাব ঘুঁচানোই তার কাছে মুখ্য।

পরবর্তীতে আব্বার সহায়তায় ওই হাফেজ সাহেবকে মোটামুটি সম্মানজনক বেতনে আমাদের স্থানীয় একটি মাদরাসার হেফজখানায় চাকরির ব্যবস্থা করা হয়।

দুই: 

আমি এর আগে বেশ কয়েকবার উত্তরবঙ্গে বেশি করে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কথা বলেছি। তখন সেটা বলেছিলাম সে অঞ্চলে মাদরাসার কমতি থাকার কারণে এবং আমার বাস্তব কিছু অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে। কিন্তু আব্বার মুখে এই ঘটনা শোনার পর আমার মনে হয়েছে, শুধু মাদরাসা প্রতিষ্ঠাই শেষকথা নয়, সেখানে আলেম-হাফেজদের যোগ্য কর্মসংস্থানেরও অভাব রয়েছে।

ব্যাপারটা অনেকটা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো। মাদরাসা বেশি প্রতিষ্ঠা হলে আলেমদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, আবার আলেমদের ‘সম্মানজনক’ জীবিকার (বেতন-ভাতা) জন্যও অধিক পরিমাণ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। একটার সঙ্গে আরেকটা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মোটকথা, সেখানে অধিক হারে মাদরাসা প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই।

আমার একান্ত অনুরোধ—
উত্তরবঙ্গের যেসব আলেম দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষকতা করছেন, তারা এবার নিজের মাটির কাছে ফিরে আসুন। বড় মাদরাসা, বড় পদ আর মোটা টাকা উপার্জনের আকর্ষণ মাড়িয়ে ফিরে আসুন আপনার প্রাণের স্পন্দনের কাছে। উত্তরবঙ্গের প্রতিটি গ্রাম-জনপদ আপনাদের ডাকছে। আপনার পরিচিত গ্রাম, ফসলের খেত, পথ, নদী আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।

নিজ এলাকায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা শুরু করুন। যতোটুকু সম্ভব, সেভাবেই শুরু করুন। মক্তব দিয়ে শুরু করুন, একদিন জামিয়া হবেই। আজ তিন হাজার টাকা সম্মানী পাচ্ছেন, একদিন এই জামিয়া আপনার ইহকাল-পরকাল ভরপুর করে দেবে। নিয়ত খালেস রাখুন, বুকে সাহস বাঁধুন, লক্ষ্য রাখুন দৃঢ়; কোনো বাধাই আপনাকে দমাতে পারবে না। পুরো উত্তরবঙ্গজুড়ে প্রচুর মাদরাসা প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন, উত্তরবঙ্গের সকল আলেমের ওপর এটা ফরজে আইন। আপনারা শুরু করুন, একদিন এ উত্তরবঙ্গই হবে বাংলাদেশে ইসলাম রক্ষার সবচে শক্তিশালী দুর্গ, সুদৃঢ় জনপদ।

আজ থেকে দশ বছর পর উত্তরবঙ্গে অন্তত বিশটা দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) মানসম্পন্ন মাদরাসা দেখতে চাই।

রাজধানী কিংবা বড় শহরের চাকচিক্য পেছনে ফেলে চলে আসুন এই দারিদ্রপীড়িত মানুষের দহলিজে। চিন্তা করবেন না, এই দরিদ্রদের মাঝ থেকেই একদিন জন্ম নিয়েছিল— আবু হুরায়রা, ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, কাব, মুসআব, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহুমের মতো প্রাজ্ঞজন। যাদের প্রজ্ঞার আলোয় আজও আলোকিত হয়ে আছে সমগ্র কায়েনাত।

মনে রাখবেন, সপ্তম শতকে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ইসলাম আগমন করেছিল এই উত্তরবঙ্গে। এ অঞ্চলেই শুয়ে আছেন শত সহস্র মুবাল্লিগে ইসলাম, যারা নিজেদের সর্বস্ব ত্যাগ করে এ অঞ্চলকে ইসলামের আলোয় আলোকিত করতে এসেছিলেন। এই উত্তরবঙ্গ থেকেই সারা বঙ্গভূমিতে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল। অথচ কী দুঃখের কথা, আজ সে জনপদ ধর্মহীনতার মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে অথচ সেখানকার মুবাল্লিগরা জনপদের ব্যাপারে বেখবর। তারা নিজেদের জনপদকে খ্রিষ্টান মিশনারিদের হাওলা করে নিজেরা হিজরত করে চলে গেছেন নিশ্চিত উপার্জনের উচ্চাশায়।

দেখুন, ইসলাম বেশিরভাগ সময়েই ধনী বা শাসকদের হাত ধরে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা পায়নি। সকল নবি এবং আমাদের বিগত চৌদ্দ শো বছরের ইতিহাসের দিক তাকিয়ে দেখুন, ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়েছে সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষের হাত ধরে। আরব থেকে শুরু করে আমাদের উপমহাদেশ, বিশেষত বাংলাদেশেও ইসলাম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সমাজের সবচেয়ে নিগৃহীত জনপদের হাত ধরে। আমাদের রাসুল নিজে দারিদ্রতাকে ভালোবেসেছেন এবং তার উম্মতকেও বলে গেছেন সবসময় দরিদ্রদের সঙ্গে সঙ্গে থাকতে।

সুতরাং রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারি, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও এবং এতদসংলগ্ন এলাকার যেসব মাওলানা সাহেবরা নিজ এলাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় ‘খেদমতে’ লিপ্ত, তারা প্রতিমুহূর্তে একটি দায়িত্ব লঙ্ঘন করার ‘পাপের’ ভাগীদার হচ্ছেন। আল-কুরআনে আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন—
‘…সুতরাং তাদের প্রত্যেকটি বড় দল হতে এক একটি ছোট দল বের হয় না কেন, যাতে অবশিষ্ট লোক ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং যাতে তারা নিজ সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে এলে তাদেরকে সতর্ক করতে পারে। যাতে তারা সাবধান হতে পারে।’ (সুরা তওবা, আয়াত ১২২)

আজ তাই, উত্তরবঙ্গ ডাকছে বাংলার লাখ লাখ আলেম ও দায়িকে। ফিরে আসুন এই বরকতময় ও স্মৃতিধন্য পুণ্যভূমিতে।

পূর্ববর্তি সংবাদসৈয়দ আবুল মকসুদ-এর হাতে বার্ষিক প্রকাশনা তুলে দিলেন ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ
পরবর্তি সংবাদরহিম স্টিল মিলের চুল্লি বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৩