আতাউর রহমান খসরু ।।
ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি রিপোর্ট ও সুপারিশ বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ঢাকার একটি অনলাইন পোর্টাল। ২০১৯ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের বিরুদ্ধে উত্তেজনাপূর্ণ ও রাষ্ট্র বিরোধী বক্তব্য প্রদানসহ বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়েছে। রিপোর্টে ১৫জন বক্তার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘এই বক্তারা সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মবিদ্বেষ, নারী বিদ্বেষ, জঙ্গিবাদ, গণতন্ত্রবিরোধী ও দেশীয় সংস্কৃতিবিরোধী বয়ান দেন বলে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা রেডিক্যালাইজড হয়ে উগ্রবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে।’ এছাড়াও বর্তমানে ধর্ষণের জন্য ওয়াজ মাহফিলগুলোকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছে দেশের বাম ছাত্রসংগঠন ও এক শ্রেণীর প্রগতিশীল।
২০১৯ সালের সেই প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী ওয়াজ মাহফিলের বক্তাদের আয়ের উপর করারোপ, তাদের বক্তব্য মনিটরিং ও তাদের ‘অসংযত’ বক্তব্যের ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ৬টি সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর বর্তমানে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বিরোধী বিক্ষোভে ওয়াজ-মাহফিলগুলোকে ধর্ষণের জন্য দায়ী করে বক্তব্য দেওয়া বাম ছাত্রসংগঠন ও কথিত নারীবাদীরা ওয়াজ-মাহফিলের আলোচনা বন্ধ ও এই আলোচনাগুলোকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করার দাবি তোলেন।
২০১৯ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা সেই তালিকায় নাম ছিল জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার সিনিয়র মুহাদ্দিস ও সময়ের জনপ্রিয় বক্তা মাওলানা মামুনুল হকের। ইসলাম টাইমস মাওলানা মামুনুল হকের মুখোমুখি হয়েছিলো এসব বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে।
তিনি প্রথমেই রিপোর্টের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, আমার মনে হয় এর পেছনে ইসলাম বিদ্বেষী একটি মহলের প্ররোচনা আছে। ওয়াজ-মাহফিল উলামায়ে কেরামের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংযোগের মুখ্য জায়গা। এই জায়গায় ছন্দপতন ঘটানো গেলে সমাজ থেকে ইসলামি বিশ্বাস ও মূল্যবোধের জায়গাটা দুর্বল করা যাবে –যা তাদের উদ্দেশ্য পূরণের পথ সুগম করবে।
তিনি বিষয়টির ব্যাখ্যা করেন এভাবে, উলামায়ে কেরাম ওয়াজ মাহফিলে ইসলাম বিদ্বেষী ও বাতিল ফেরকা, দেশ ও সমাজে ইসলাম বিরোধী যে সংস্কৃতি-আচার পালিত হয় –যার কিছু কিছু বিষয়ের সাথে ঈমানের প্রশ্নজড়িত- এসব বিষয়ে কথা বলেন। এতে সমাজে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি হয়। সাথে সাথে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার চেয়ে ইসলামি সমাজব্যবস্থা, ইসলামি বিধি-বিধান যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার –বিষয়গুলো ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়। যারা এই সচেতনতা ও ইসলামি চিন্তা-চেতনা ও মূল্যবোধের প্রসার পছন্দ করেন না তাদের কেউ কেউ এর পেছনে ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করতে পারেন।
যখন বললাম, সুপারিশের মধ্যে এমন কিছু বিষয়ও আছে যার ব্যাপারে আপনিও হয়তো একমত হবেন। উত্তরে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, এখানে অধিকাংশ সুপারিশগুলো এমন যার সঙ্গে উলামায়ে কেরাম একমত হবেন। কিন্তু বিষয়গুলোকে কৌশলের অংশ বলেই মনে হয় আমার। যেন সাধারণ আলেম সমাজের একটা সমর্থন আদায় করা যায়। রিপোর্টে যে ভালো কথাগুলো আছে তাকে আমি রিপোর্টের মূল উদ্দেশ্য মনে করি না।
তিনি আরও বলেন, এখানে এমন কিছু বিষয় আছে যা অবশ্যই ইতিবাচক। তবে সেগুলো প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য নয়। ইতিবাচক দিকগুলো যুক্ত করা হয়েছে আমাদের সহযোগিতা ও সিম্পেথি নেওয়ার জন্য। সুতরাং আমরা যেন বিভ্রান্ত না হই। সত্যিই যদি সরকার ওয়াজ-মাহফিলের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে সক্ষম হয়, তবে আখেরে ইসলাম ও মুসলমানই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তিনি তার সংশয় ও সন্দেহের বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে বলেন, এই রিপোর্টে বক্তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা পুরোপুরি প্রমাণিত হয় এমন বেশ কিছু পক্ষের নাম তালিকায় আসেনি। যেমন, মাজারপূজারী ও হেজবুত তাওহীদের কারো নাম আসেনি।
একইভাবে দেওয়ানবাগীর পীরের নাম উল্লেখকেও তিনি বিভ্রান্তি সৃষ্টির একটি প্রয়াস বলে মনে করেন। তার ভাষায়, দেওয়ানবাগীর মতো একজন ভণ্ড ও ঈমানহীন ব্যক্তির নাম একই তালিকায় জুড়ে দিয়ে হক্বানি উলামায়ে কেরামকে অসম্মানিত করা হয়েছে। এতে ধোঁকা ও প্রতারণার একটি প্রবণতা কাজ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তাহলে কী বক্তাদের কোনো দায় নেই? বক্তাদের সেসব কথা কোট করা হয়েছে তার ভিডিও ক্লিপস তো পাওয়া যায়।’ উত্তরে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আমি বলবো না যে, অভিযোগের কোনো সত্যতাই নেই। তবে এটাকে আমি সমাধানের কোনো পথ মনে করি না।
তিনি মনে করেন, ওয়াজ-মাহফিলের যে বিষয়গুলো বিভ্রান্তি তৈরি করছে বলে মনে করা হয় যেসব বিষয়ে আলেমদের সর্বোচ্চ অথরিটি আল-হাইয়াতুল উলয়া একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যদের এই ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ সুফল বয়ে আনবে না এবং তা গ্রহণযোগ্যও হবে না।
উলামায়ে কেরাম বিষয়গুলোতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেন তিনি। বলেন, অসংযত কোনো কথা হলে তা ধরে দেওয়ার জন্য উলামায়ে কেরামে আছেন। উলামায়ে কেরাম নিজ নিজ জায়গা থেকে এসব বিষয়ে সংযত হওয়ার তাগিদ দিয়ে আসছেন। ওয়াজ-মাহফিলেও তো বক্তাদের অসংযত আচরণ ও বক্তব্যের প্রতিবাদ হচ্ছে নিয়মিত। বক্তার কথায় বিভ্রান্তি তৈরি হলে তা দূর করছেন উলামায়ে কেরাম এবং ওয়াজ মাহফিলেই তা করছেন।
মাওলানা মামুনুল হক আরও বলেন, তরুণ ও সম্ভাবনাময় বক্তাদের সংযত আচরণ, ভাষা ও বক্তৃতার কৌশল ইত্যাদি শেখানো আমাদের দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে। কিছু কিছু দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও সংগঠন তা সীমিত পরিসরে হলেও করছে। চলছে এবং সামনে আরও বিস্তৃত হবে হয়তো।
তিনি তরুণ বক্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, তরুণদের বলবো, তারা যেন ওয়াজকে দায়িত্ব হিসেবে নেন। পেশা হিসেবে না নেন। মুরব্বিদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। তাদের তত্ত্বাবধান ও পরামর্শ মেনে কাজ করেন।
আর বক্তাদের আয়ের উপর করারোপ করার যে সুপারিশ করা হয়েছে তাকে কি যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন? মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আয়কর কোনো ব্যক্তির পেশার সঙ্গে জড়িত না। তাহলে এখানে ওয়াজ-মাহফিলের বক্তাদের নাম কেন নিতে হবে? এটা নির্ধারিত হয় ব্যক্তির আয়-উপার্জন ও সম্পদ অনুযায়ী। বর্তমানে কোনো ব্যক্তি টিন সার্টিফিকেট ছাড়া তার আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন না। কোনো বক্তার আয় যদি করের সীমা অতিক্রম করে সে কর দেবে। তাতে সমস্যা কী? এমন তো নয় যে, কোনো বক্তাই কর প্রদান করেন না? আমার মনে হয়, এখানে প্রকারান্তরে ওয়ায়েজিনদের অপমান করা হয়েছে।
সবশেষে তিনি উলামায়ে কেরামের প্রতি আহবান জানান, তারা যেন এই বিষয়ে সব ধরনের চালাকি ও প্রতারণামূলক কৌশলের ব্যাপারে সতর্ক থাকেন। নতুবা সাধারণ মানুষের সঙ্গে উলামায়ে কেরামের এই সেতুবন্ধন ভেঙ্গে গেলে, উভয়ের মাঝে কোনো পর্দা তৈরি হলে এদেশের ইসলাম ও মুসলমানই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
















