আরব বসন্ত কি ফুরিয়ে গেছে?

সাম হামাদ।।
মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্তের পর যা ঘটে গেল এরপর আসলে এ কথা বলা খুবই হাস্যকর শোনায় যে আরব বসন্ত এখনো জীবিত আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো আরব বসন্তের যা উদ্দেশ্য, জালিম শাসকদের থেকে মুক্তি লাভের আকুতি, তা কিন্তু দিন দিন মানুষের মাঝে বেড়েই চলেছে।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক দেশগুলোর কয়জন মানুষ লক্ষ লক্ষ মোহাম্মদ বোয়াজিজির প্রতিদিনের আশা এবং ব্যর্থতার কথা জানত যারা নিজ দেশে জীবন বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করছিল?
কয়জন মানুষ মিসরের খালেদ সাঈদীর স্বপ্ন আর ভয়ের কথা জানত?
 
তিউনিসিয়ায় মোহাম্মদ বোয়াজিজির নিজেকে জ্বালিয়ে দেওয়া, নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া আর মিসরে খালেদ সাঈদের নির্যাতিত-নিপীড়িত অবস্থায় নিহত হওয়ার ঘটনাই তো আরবদের মাঝে এক সামাজিক জাগরণ সৃষ্টি করেছে। যে জাগরণকে অল্প সময়ের জন্য হলেও বিশ্ব স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে।
 
কিন্তু এক বছরের মাথায় আরব বসন্ত পরিণত হলো আরব উইন্টারে। মিশর লিবিয়া সিরিয়া সব জায়গাতেই একই অবস্থা। সব জায়গায়ই গণঅভ্যুত্থান এর পিছনে এমন দল ও আন্দোলন সক্রিয় ছিল যারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় আবেগের প্রতিনিধিত্ব করে, যা স্বৈরশাসকদের কখনো পসন্দ হয়নি।
 
অবশেষে অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থান করা হলো। যার সাধারণ ফল হল- মিশরে জনগণের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলো। এই পাল্টা অভ্যুত্থানের ভয়াবহ পরিণতি হচ্ছে, অভ্যুথান থামানোর জন্যে সিরিয়ায় গণহত্যা চালানো হলো।
 
যারা দাবি করেছে, আরব বসন্তের ফলাফল এই হয়েছে যে, মিশরে মুরসির মত কট্টরপন্থী সরকার এসেছে। এ অভিযোগকারীরা চুপ হয়ে যান যখন দেখেন, এই অভ্যুত্থান দমন করার জন্য যারা এসেছে তারা রাবা স্কয়ারে লাশের পাহাড় তৈরি করেছে।
 
যারা বলেন, সিরিয়ায় প্রতিবিপ্লব হওয়ার আসল কারণ হলো, সিরিয়া অভ্যুত্থানের ভিতর দিয়ে ইসলামী চরমপন্থীদের উত্থান হতে যাচিছল তারা মুখে কুলুপ আঁটেন যখন দেখেন- সিরিয়ায় বিপ্লবদমনকারী সরকারী বাহিনীর হাতে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ মারা গেছে। শিশুরা রাসায়নিক গ্যাস মারা যাচ্ছে।
 
প্রায় সব জায়গায় এই প্রতিবিপ্লবগুলো সফল হয়েছে কিংবা ইউরোপীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে কোন ধরনের বাধা বিপত্তি ছাড়াই সফল হতে দেওয়া হয়েছে ।
 
গণতন্ত্রের ধারক বাহক বলে দাবি করে যেসব দেশ তারাও এই অভ্যুত্থান বিরোধী শক্তি যেন জয়ী হতে পারে সে জন্যই সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে। আর যে সকল দেশ গণতন্ত্রবিরোধী- ইরান রাশিয়া সৌদি আরব আরব আমিরাত- তারা তো শুরু থেকেই গণতন্ত্রকে উৎখাত করতে ব্যস্ত ছিলেন।
 
সম্প্রতি আমরা দেখেছি যে সুদানে এক গণ আন্দোলন হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক ওমর আল বাশিরকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছে।
 
কিন্তু এরপর কয়েকদিন যেতে না যেতেই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেল। সৌদি আরব আরব আমিরাত সমর্থিত সেনাবাহিনীর সমঝোতার অবস্থান থেকে সরে গিয়ে আন্দোলনকারীদেরকে দমন করা শুরু করল। যেভাবে রাবা স্কয়ারে ২০১৩ সালে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকারীদেরকে গণহত্যা করা হয়েছে সেরকম কায়দা সুদানেও এক দিনেই একশর অধিক লোককে হত্যা করা হয়েছে।
 
 সেই দমন-পীড়নের ধারা এখনো চলছে সুদানে।  সুদানে যতই মানুষ মারা যাক, ইউরোপ আমেরিকা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করবে না। এমনটি  আমরা মিশরের বেলায় দেখতে পেয়েছি।
 
লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের আট বছর পর এখনও পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক হয়নি। যারা একসময় গাদ্দাফির বিরুদ্ধে বিপ্লবীদেরকে সহযোগিতা করেছিল তারাই এখন দেশের ভেতর বিপ্লবীদের সাথে যুদ্ধ উস্কে দিচ্ছে।
 
ফ্রান্স যদিও জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে জেনারেল হাফতারের আক্রমণমূলক কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানায় কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো, এই ফ্রান্স হাফতারকে দুই বছর ধরে অস্ত্র সহায়তাসহ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
 
জেনারেল হাফতার লিবিয়ায় মিসরের সিসির মত। হাফতারের সহযোগিতায় রয়েছে বিপ্লব দমনকারী রাষ্ট্রগুলো যেমন সৌদি আরব আমিরাত মিশর এবং রাশিয়া।
 
প্রকৃতপক্ষে লিবিয়ায় ডেমোক্রেসি নেই বললেই চলে। ফ্রান্স যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অগ্রদূত। কিন্তু তাদের কাজ সরকারকে লিপ সার্ভিস দেয়া আর বাস্তবক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে হাফতারকে সাহায্য করা। এমনটি ইউরোপের ক্ষেত্রে সব জায়গাতেই ঘটেছে।
 
এসব ঘটনাকে সামনে রেখে আমরা বলতে পারি, আরব বসন্ত ফুরিয়ে গেছে,  এ  কথা বলা খুব সহজ। কিন্তু এত দমন পীড়নের পরও সুদানে লিবিয়ায় গণমানুষের বিস্ফোরণ এটাই প্রমাণ করে যে,  মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোতে স্বাধীনতার জন্য সাধারণ মানুষের যুদ্ধ এখনো  থেমে যায়নি।
 টিআরটি ওয়ার্ল্ড থেকে অনুবাদ: এনাম হাসান জুনাইদ
পূর্ববর্তি সংবাদকুলাউড়া ট্রেনদুর্ঘটনা: তিন কার্যদিবসের প্রতিবেদন ছয় কার্যদিবসেও জমা হয়নি
পরবর্তি সংবাদরাজধানীতে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪