মুহাম্মাদ আদম আলী ।।
বেশ কয়েকদিন সূর্যের দেখা নেই। রাতের আকাশে তারাও দেখা যাচ্ছে না। কালো মেঘলা আকাশ। দিন-রাত একই অবস্থা। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। ভারী বৃষ্টি। এ বৃষ্টিতে পথ-ঘাট সব ডুবে যাচ্ছে। উঁচু দালান থেকে দেখলে এ বৃষ্টি হয়তো ভালোই লাগে। রাস্তায় নামলে কষ্টের সীমা থাকে না। সাগরের পাড়ে চট্টগ্রাম শহর। এ শহরেই জলাবদ্ধতা বেশি। শহরের রাস্তায় গাড়ির চাকা প্রায় ডুবে যায়।
হযরতের সাথে চট্টগ্রামে সফরে এসেছি। সারাদিন কাফকোতে প্রোগ্রাম হয়েছে। রাতে চাঁন্দগাও আবাসিক এলাকায় থাকতে হবে। এখানে হযরতের একটা মকতব আছে। মকতবে থাকব। রমযানে এখানে মানুষজন ছিল। এখন কেউ নেই। একজন খাদেম থাকার কথা। সেও নেই। রাস্তার পানি পেরিয়ে ঘরে ঢুকেছি রাত এগারটায়। নিজেরাই বিছানা-চাদর রেডি করে কেবল শুয়েছি। ঘুমও প্রায় চলে এসেছে। এ সময় দরজার সামনে একটা মানুষের অবয়ব মনে ভয় ধরিয়ে দিল।
রাত সাড়ে বারটা বাজে। কারও তো আসার কথা না। সাহস করে দরজা খুললাম।
‘কে?’
‘আমি মাদরাসার খাদেম।’
‘এত রাতে কোথা থেকে এলে?’
‘ঢাকা থেকে।’
‘রাতে খেয়েছ?’
‘না।’
‘বাসায় তো খাবার-দাবার কিছু নেই। এখন ঘুমিয়ে থাক। সকালে দেখা যাবে।’
সকাল হলো। ফজরের নামায শেষ করেই হযরত খাদেমকে ডাকলেন। রাতে সে কিছু খায়নি। এখন তাকে কিছু খাওয়াতে হবে। এত সকালে দোকান খোলা পাওয়ার কথা না। বৃষ্টিতে বাড়ির সামনের রাস্তা ডুবে আছে। পানি পেরিয়ে ভারী বৃষ্টিতে কোথায় গেলে যে কিছু খাওয়া যাবে, কেউ জানে না। হযরত দু-জনকে দিয়ে এর মধ্যে খাদেমকে পাঠালেন। আমরা কিছু বলতে চাচ্ছিলাম। হযরতের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতে সাহস হয়নি।
দু-জন খাদেমকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ। টিনের চালে বৃষ্টির ছন্দময় শব্দ হয়। দালান ঘরে বৃষ্টির শব্দ ততটা পাওয়া যায় না। এখানে বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে। খুব জোরে বৃষ্টি হচ্ছে। বিল্ডিং এর নীচতলায় মকতব। নীচতলা না হলে হয়তো বৃষ্টির শব্দ পাওয়া যেত না। এ বৃষ্টিতে ছাতায় মাথাটা শুধু বাঁচানো যায়। শরীর বাঁচে না। কাপড়-চোপড় ভিজে যায়। মিনিট দশেক পরে খাদেম ভেজা কাপড়ে ফিরে এলো। কোনো দোকান-পাট খোলা পায়নি। কিছু খেতেও পারেনি।
হযরত চিন্তিত। সারারাত খাদেম কিছু খায়নি। এখন নিশ্চয়ই ক্ষুধা চরম পর্যায়ে ঠেকেছে। এ মুহূর্তেই তাকে কিছু খাওয়ানো দরকার। এজন্য হযরত বললেন,‘আমি যদি তাকে নিয়ে যাই, তাহলে অবশ্যই তাকে কিছু খাইয়ে নিতে আসতে পারব। কমান্ডার, তুমি যাও। তুমি না পারলে, আমি যাব।’
আমি যাবার জন্য উঠলাম। আমার ছাতা নেই। একজনের ব্যাগে একটা সুন্দর ছাতা আছে। এখনো মনে হয় সেটা ব্যবহার হয়নি। এরকম ছাতা কাউকে দিতে ইচ্ছে করে না। তিনি খুব ভালো মানুষ। আমাকে সেটা ব্যাগ থেকে বের করে দিলেন। আমি খাদেমকে নিয়ে রওনা হলাম।
বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষণ নেই। প্রচণ্ড বৃষ্টি। ছাতায় বৃষ্টি মানছে না। এদিক-সেদিক কাপড় ভিজে যাচ্ছে। একবার শরীর ভিজে গেলে আর ভেজার ভয় থাকে না। মাথাটুকু বাঁচিয়ে হাঁটছি। রাস্তায় জমে থাকা পানিতে হাঁটার চপ চপ শব্দ হচ্ছে। খাদেমের জন্য আমার মায়া হচ্ছে না। রাগ হচ্ছে। খাদেমদের কাজই হচ্ছে মনিবদের কষ্ট দেওয়া। আমিও হযরতের খাদেম। নিজের কথা মনে হতেই রাগ কমে এলো। হযরতকে কে কবে শান্তি দিয়েছে! যারা অন্যের শান্তির জন্য দৌঁড়ান, তারা নিজের শান্তির কথা চিন্তা করেন না।
খাদেমের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘রাতে কেন খেলে না?’
‘দোকান-পাট সব বন্ধ ছিল।’
‘বাস স্টেশনে কিছু দোকান তো খোলা থাকেই। এত রাতে বিরানী খুঁজলে তো আর পাবে না। বন-কলা তো খেতে পারতে!’
‘পারিনি স্যার।’
‘এখন যদি তোমাকে কিছু খাওয়াতে না পারি, তাহলে হযরত নিজেই এই বৃষ্টির ভেতর তোমাকে নিয়ে বের হবেন। তখন কেমন হবে?’
খাদেম চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। আমার কথা শুনে সে লজ্জিত কি না তাও বোঝা যাচ্ছে না। যতক্ষণ তাকে কিছু খাওয়াতে না পারছি, ততক্ষণ বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হবে। কিছুতেই ফিরে যাওয়া যাবে না। নীরব রাস্তা। বাড়ির দেয়াল উপচে গাছের ডাল রাস্তার মাঝ বরাবর বেড়ে উঠছে। সে গাছের পাতায় বৃষ্টি পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। এ শব্দে ঘুম কাতুরে মানুষগুলো আরও ঘুমাচ্ছে। আজ মনে হয় কেউ সহজে দোকান-পাট খুলবে না।
এ এলাকাটা আমার পরিচিত। অনেক আগে পরিবার নিয়ে এখানে কিছু দিন ছিলাম। কাছাকাছি একটা মসজিদ আছে। তারও পশ্চিমে একটা গ্রাম। চাঁন্দগাও আবাসিক এলাকা যেমন উন্নতি হয়েছে, এ গ্রামের তেমন কিছু হয়নি। মানুষজনও খুব সাদাসিধে। সেখানে সকালে কিছু দোকান খোলা পাওয়া যেতে পারে। এজন্য সেদিকেই গেলাম।
আলহামদুলিল্লাহ, কিছু একটা পেয়েছি মনে হলো। তিন গলির মোড়ে একটা ঘর। ভাঙা বেড়া আর টিনের চালের নিচে কোনোমতে ঘরটা টিকে আছে। ঘরের সামনে মানুষের ভিড়। কাছে গিয়ে দেখলাম এটা একটা হোটেল। ভেতরের অবস্থা তেমন ভালো না। বিশাল একটা তন্দুরি বানানোর চুলা দেখে চোখ বড় হয়ে গেল। তন্দুরির পাশেই বড় কড়াইতে লুচি ভাজা হচ্ছে। টুকরীতে সেগুলো জমা করা হচ্ছে। গরম লুচির স্তুপ। লাইন ধরে মানুষ কিনে নিয়ে যাচ্ছে। খাদেমকে লুচি আর ডাল খেতে দিলাম।
হোটেলে বসার ভালো কোনো জায়গা নেই। দরজার পাশে একটা লম্বা টুল। সেটার অর্ধেকটা বৃষ্টিতে ভিজে আছে। সেটার উপর কোনোমতে বসলাম। বসে বসে লুচি ভাজা দেখছি। ভাজা বেশিক্ষণ দেখা গেল না। খেতে ইচ্ছে করছে। হযরত তো খাদেমকে খেতে পাঠিয়েছেন। আমাকে খেতে বলেননি। খাবার দরকারও ছিল না। তবু চা আর লুচির অর্ডার দিলাম। পকেটে টাকা থাকলে খাওয়া আটকানো যায় না। খাওয়া হয়ে গেল। হযরত মুড়ি নিয়ে যেতে বলেছেন। হোটেলে কেউ মুড়ি বেঁচে না। অদ্ভুত ব্যাপার! এই হোটেলটাতে মুড়ি আছে। একটা প্যাকেটই ছিল। সেটা নিয়ে ফিরলাম।
বাসায় একটা স্বস্তি নিয়েই ফিরলাম। খাদেমকে খাওয়ানো গেছে। মুড়িও পাওয়া গেছে। একটা প্লেটে হযরতকে মুড়ি দিয়ে পাশে বসলাম। হযরত এক মুঠ মুড়ি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘আদম আলী মনে হয় কিছু খেয়ে এসেছে! একলা কীভাবে খায় আমাদেরকে ফেলে?’
আমি তো অবাক। কী বলব বুঝতে পারলাম না। ধরা পড়ে গেলাম। আল্লাহওয়ালাদের চোখকে এড়ানো যায় না। শায়েখের খেদমতে এসে মুরীদের নিজের আরাম-আয়েশের খেয়াল করতে নেই। নতুন করে শেখা হল একটা পুরাতন সবক।
লেখক: প্রফেসর হজরত হামীদুর রহমানের খলিফা, সাবেক কমান্ডার নৌবাহিনী, সাহিত্যিক
















