সাহিত্যচর্চার পেছনেও আমাদের উদ্দেশ্য থাকবে ইসলাম

মাওলানা নাসিম আরাফাত। পঞ্চাশোর্ধ বয়সের যত্নশীল আলেম-লেখক। মুহাদ্দিস। বাংলা ও আরবি উভয় ভাষায় রয়েছে তার কাজ। কিশোর উপযোগী গদ্যে সুখপাঠ্য ভাষায় বাংলাদেশের মণীষী আলেমদের নিয়ে সৃজন করেছেন স্বতন্ত্র বেশ কিছু গ্রন্থ। সাহাবায়ে কেরামের জীবন নিয়ে আরবি ভাষায় লিখেছেন। মাদরাসার ছাত্রদের জন্য বই লিখেছেন ইংরেজি ভাষা শেখার পদ্ধতি নিয়ে। রয়েছে অনুবাদেও তার সমাদৃত কাজ। লেখালেখির অঙ্গনে বিচিত্র বিচরণ তাঁর। ইসলাম টাইমস বছরপূর্তি আয়োজনে তার সামনাসামনি হয়েছেন আবু দারদা।

 

ইসলাম টাইমস: পড়ালেখার শুরু কীভাবে? কোথায় পড়েছেন? আপনার আজকের এই অবস্থানে আসতে কার অবদান বেশি বলে মনে করেন?

মাওলানা নাসিম আরাফাত: আমার পড়ালেখার সূচনা হয় স্কুল দিয়ে৷ স্কুলে সিক্স পর্যন্ত পড়ার পর স্থানীয় পরিবেশের কারণে লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তখন আমার মামাতো ভাই নুরুজ্জামান নূরীয়া মাদরাসায় পড়তো।

আমার মামা এবং আমার আব্বা চরমোনাই পীর সাহেবের মুরীদ ছিলেন। দুজনের মাঝে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। একসাথে চরমোনাই মাহফিলে যেতেন৷ তো, আমার মামা বলেন সে যেহেতু স্কুলে লেখাপড়া করতেছে না তাই মাদরাসায় ভর্তি করে দেয়া হোক। কোথায় ভর্তি করবেন? বললেন আব্বা। ঐ সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে নূরীয়া মাদরাসায়৷ চারদিকে পানি বেষ্টিত। অনেক দূর৷ গ্রাম। ওখান থেকে আসতে পারবে না৷ যাতায়াত অনেক কষ্ট। নদীর ওপারে। সেখানে দিলে সবচেয়ে সুন্দর হবে। পরিবেশ ভালো হবে।

মামা আব্বা পরামর্শ করে আমাকে নিয়ে গেলেন বাইতুল মুকাররম মসজিদে৷ তখন বাইতুল মুকাররম মসজিদে আহমাদ উল্লাহ আশরাফ রাহ. ছিলেন মুয়াজ্জিন। ওনার সাথে কী কথা বললেন তা আমি জানি না৷ দেখা করলাম তার সাথে। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন৷ তারপর একদিন আমাকে নূরীয়া মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দিলেন৷

আমাকে যখন ভর্তি করালেন তখন চান্দিনা হুজুর নামে একজন হুজুর ছিলেন৷ তিনি মেট্রিক পাস করার পর মাওলানা৷ চান্দিনা হুজুরের কাছে আমাকে সমর্পণ করে দিয়ে আসলেন আব্বা-মামা৷

তিন মাস পার হয়ে যাওয়ার পর অর্থাৎ কুরবানীর পর পরিবেশের সাথে একটা ভালো লাগা তৈরী হয়ে গেলো৷ মামাতো ভাই, আমি এবং বাসাবোর আরেকটা ছেলে মিলে আমাদের একটা পরিচিত গ্রুপ হয়ে গেলো। তখন থেকে থাকা আর সমস্যা হয় নাই।

প্রথম বছর মকতব পড়লাম৷ মকতব বেশি সময় পড়া লাগেনি৷ যেহেতু স্কুলে বাংলা, অংক, ইংরেজি পড়ে গেছি। শুধু আরবীটা পড়ে মকতব শেষ করে দিলাম৷

পরের বছর কিতাব খানায় তাইসীর জামাতে ভর্তি হলাম৷ এবং প্রথম পরীক্ষায় এক বিষয়ে ফেল করলাম৷ ফেল হলাম কুরআন শরীফ বিষয়ে। যেহেতু কুরআন শরীফ অল্প সময় পড়েছি৷ পরে অবশ্য প্রাইভেটভাবে পড়ে কুরআন শরীফ ঠিক করে নিয়েছিলাম৷

 

ইসলাম টাইমস: লেখালেখিতে কীভাবে আসলেন? এবং আপনার অনুপ্রেরণা কে ছিলো৷

মাওলানা নাসিম আরাফাত: যখন তাইসীর জামাত শেষ করার পর মিজান জামাতে উঠি তখন আদীব হুজুর মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ এসেছেন৷ আদীব হুজুর মিজানের বছর মিজান না পড়িয়ে হুজুরের পাণ্ডুলিপি থেকে আমাদের এসো আরবী শিখি পড়ালেন।

আমরা আদীব হুজুরের সোহবত পেলাম। হুজুরের মন, মস্তিষ্ক, মেধা ও আমাদের মোহিত করে দিলো। এমনকি আমরা আদীব হুজুরকে এতো মুহাব্বত করতাম যে, হুজুরকে সমাজের একজন মুজাদ্দিদ মনে করতাম৷ আদীব হুজুরের সুবাদে পাহাড়পুরী হুজুর রাহ.-এর মুহাব্বত পেলাম৷ এভাবেই মিজান ও নাহবেমীর জামাত শেষ হলো।

হেদায়াতুন্নাহুর বছর হাফেজ্জী হুজুর রাহ. খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করলেন। খেলাফত আন্দোলনের নির্বাচন থাকাকালীন সময়ও আদীব হুজুর এবং পাহাড়পুরী হুজুরের সোহবত থাকার কারণে আমাদের লেখাপড়ায় তেমন কোন ক্ষতি হয় নাই।

তারপর হাফেজ খালেদ সাহেব এবং খুলনার সিদ্দিকুর রহমান সাহেব হুজুরের সোহবত পেলাম৷ তখন নূরীয়া মাদরাসার অনেক উস্তাদ ছিলেন যারা সবসময় ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ পত্র পত্রিকায় লেখালেখি করতেন৷ তারপর খেলাফত আন্দোলন আসার কারণে সাময়িকী বের করা। তখন ‘জাগো প্রহর’ বের হতো। এসব পত্রিকার কারণে মোটামুটি লেখালেখির সাথে একটা সম্পর্ক হয়ে গেলো। তারপর নূরীয়া মাদরাসা থেকে যখন ‘ইকরা’ পত্রিকা বের হতে শুরু করলো তখন তো আরও বেশি আগ্রহ জন্মালো। এভাবে সব উস্তাদদের লেখালেখি দেখতে দেখতে আমরাও আগ্রহবোধ করতে লাগলাম৷ তবে, লেখালেখির শুরুটা আদীব হুজুরকে কেন্দ্র করে হয়েছে৷

কিন্তু, নিচের জামাতে আমার ব্রেণ খুব একটা ভালো ছিলো না। লেখাপড়া সহজে পড়তাম না৷ আলহামদুলিল্লাহ, ছোটবেলা থেকে অবিরাম মেহনত করার একটা গুণ আমার মাঝে ছিলো। কখনো আমি অলসতা করতাম না৷ পড়তে থাকতাম। পড়তে থাকতাম৷ এখনো আলহামদুলিল্লাহ, অবিরাম মেহনত করার গুণটা অল্প-বিস্তর আছে৷ একারণে ‘খারাপ ছাত্র’ হওয়া সত্ত্বেও আস্তে আস্তে আমি উপরের দিকে উঠে গেছি। মেধা তালিকায় নম্বর দুই, তিন থাকতো।  প্রথম নাম্বারে থাকতো আবু তাহের রহমানী সাহেব৷ দ্বিতীয় থাকতো আব্দুল হক সাহেব৷

এভাবে চলতে চলতে সাহিত্য ও লেখালেখির সাথে একটা সখ্যতা হলো। আরেকটু উপরের দিকে উঠে লালাবাগে ‘গ্রন্থ বিতান’নামে একটা প্রাচীন লাইব্রেরি ছিলো। ওখান থেকে বই পড়ার জযবা উঠে। কিন্তু তখন মাদরাসায় এভাবে বই পড়ার পরিবেশ ছিলো না৷ তাই বৃহস্পতিবার বাসায় আসার সময় একটা বই নিয়ে যেতাম৷ আবার মাদরাসায় যাওয়ার সময় ফেরত দিয়ে দিতাম৷ প্রায় একশো পৃষ্ঠার মতো পড়া হয়ে যেতো৷ বাসায় এসে বই-ই পড়তাম৷ আর কিছু করতাম না৷ আর বন্ধের দিনগুলোতে খুব বই পড়তাম৷ মাদরাসা বন্ধ হলে মাদরাসার পড়াও বন্ধ হয়ে যেতো। এই সময়ে সাহিত্য চর্চা করা ও অনান্য বই পড়তাম৷

 

মাঝে মাঝে বাসা থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে গিয়ে পড়তাম। সকালে গোসল করে যেতাম। সাথে রুটি চিনি পেঁচিয়ে নিয়ে যেতাম৷ দুপুরবেলা রুটি চিনি খেয়ে আবার পড়তে বসতাম একদম এশার নামাজের সময় বের হতাম। তখন এশার নামাজ পর্যন্ত ইফা খোলা থাকতো৷ এশার আজান দিলে হেঁটে হেঁটে রাজারবাগ এসে এশার নামাজ পড়ে বাসায় চলে আসতাম৷ এভাবে একটা সাধনার জিন্দেগী কেটেছে৷

তারপর মাঝখানে ‘লাজনাতুত্বলাবা আস সাওরিয়্যাহ’ নামে ছাত্রদের একটা সাহিত্য সংগঠন ছিলো। যার পরিচালনায় ছিলেন কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রাহ., মাওলানা ইসহাক ফরিদী রাহ., মাওলানা আবু তাহের মিছবাহ, মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ এবং মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রাহ.। ওনারা মাঝে মাঝে প্রোগ্রাম ও কর্মশালা করতেন৷ এগুলোতে অংশগ্রহণ করতাম৷ যদিও আমি ওনাদের দলে ছিলাম না৷ কিন্তু শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে শরীক হতাম৷ পরবর্তীতে অনেকে এই সংগঠন থেকে সরে গিয়েছিলেন৷

 

ইসলাম টাইমস: নানান বিষয় নিয়ে আপনার বইপত্র রয়েছে। এগুলোর মধ্যে জীবনবৃত্তিক সিরিজ শুরু করার কারণ কী ছিলো?

মাওলানা নাসিম আরাফাত: বেশ আগের থেকে আমার খেয়াল আসছিলো বাংলাদেশের আলেমরা ত্যাগ-তিতিক্ষা, কষ্ট, মোজাহাদা করে ইসলামকে এদেশের মাটিতে নিয়ে আসছেন৷ ইংরেজদের শোষণের পর  হিন্দুরা বাংলার বুকে ঝেঁকে বসে জুলুম-অত্যাচার করেছে। এই হিন্দু রাজাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করে আমাদের পূর্বসূরি ওলামায়ে কেরাম ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করেছেন৷ তারপর যারা মেহনত মোজাহাদা করে ইসলামকে প্রচার করেছেন। ওনাদের কোন জীবনী আমাদের হাতে নাই৷ হাতে থাকলেও তা ছিলো আঞ্চলিকভাবে ছড়ানো ছিটানো। জাতীয়ভাবে সুন্দর করে সাজানো ছিলো না৷

আমাদের আকাবিররাই ত আমাদের দিশা। ওনাদের মেহনত মোজাহাদার কীর্তি পড়ার পর-ই তো আমরা চলার পথ পাবো৷ এই একটা চিন্তা আমার দিলে এসেছে। উর্দূতে অনেক আকাবীরের জীবনী আছে। তা অনুবাদ ও হচ্ছে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশী যেসব আকাবীর ছিলেন তাদের মেহনত মোজাহাদার কথা আমরা ভুলে যাচ্ছি। হযরত শামসুল হক ফরিদপুরী রাহ., হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ, হযরত পীরজী হুজুর ওনারা ঢাকায় এসে আলেমদের যে বিপ্লব ঘটালেন ওনাদের জীবনীটা ও আমাদের মাঝে সুন্দরভাবে ছিলো না।

আমি পীরজী হুজুর রাহ.-এর জীবনীর জন্য ওনার ছেলের সাথে এবং ওনার নাতির সাথে যোগাযোগ করেছি। ওনারা আমাকে তেমন কোন তথ্য দিতে পারেনি৷ আলহামদুলিল্লাহ, হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর স্মারকগ্রন্থ ও শামসুল হক ফরিদপুরী রাহ.-এর স্মারকগ্রন্থ পাঠ করে অনেক তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি। এসমস্ত কারণে আমার খেয়াল হলো আমাদের বাংলাদেশের আাকবীরদের মধ্যে অন্তত দশ থেকে পনেরোজনের যদি জীবনী থাকে তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা দিকনির্দেশনা হবে। যেমন, কিশোরগঞ্জের আতহার আলী রাহ.-এর একটা বৈচিত্র্যময় জীবন ছিলো। কিন্তু তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবন নিয়ে তেমন কোন কাজ হয়নি৷

এই সমস্ত বিষয়গুলো ভাবতে ভাবতে মনে হলো আমাদের আকাবীরদের জীবনী লেখা লেখা দরকার৷ আকাবীরদের জীবনী থেকে আমরা আলো পাবো৷ দিশা পাবো৷ বাংলাদেশে ইসলামের খেদমত করার জন্য ওনারা যে মেহনত করে গেছেন তাদের জীবনী পাঠ করলে আমাদের ও ইসলামের খেদমত করার জন্য একটা ইচ্ছা পয়দা হবে৷ এই দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা শুরু করেছি৷

ইসলাম টাইমস: জীবনভিত্তিক সিরিজ কয়টা বই ছাপা হয়েছে?  সামনে কোন বইটি আসছে আপনার উৎসাহী পাঠকদের যদি জানাতেন।

মাওলানা নাসিম আরাফাত: চারটা লেখা হয়েছে। এখন পাঁচ নাম্বারটার বাংলাদেশের প্রবীণ আলেম উজানীর ক্বারী ইবরাহীম সাহেব রাহ.-এর জীবনী। আলহামদুলিল্লাহ লেখা হয়ে গেছে। পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত আছে। প্রচ্ছদ ও হয়ে গেছে। চলতি মাসের মধ্যে বই এসে যাবে৷

ইসলাম টাইমস: লেখালেখির জন্য আপনার প্রিয় মুহূর্ত কখন?

মাওলানা নাসিম আরাফাত: আমার লেখার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হলো ফজরের আগে এবং পরে। এই সময়ে লেখতে বসলে ভাব, শব্দ এতো বেশি আসে যা অন্য সময় আসে না। জেহেন পরিচ্ছন্ন থাকে তাই অনেক কিছু স্মরণ হয়।

 

ইসলাম টাইমস: হাফেজ্জী হুজুরের খেলাফত আন্দোলনের উত্তাল সময় আপনি দেখেছেন। সেসময়ের কোন একটা স্মৃতির কথা যদি আমাদের বলতেন?

মাওলানা নাসিম আরাফাত: তখন আমি হেদায়াতুন্নাহু পড়ি। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় ছিলো। মিছিল মিটিং  বন্ধ করে ১৪৪ ধারা জারী করে দিল৷ সেটা ভঙ্গ করে হাফেজ্জী হুজুর রাহ. মিছিল করলেন৷ আমরা বিক্ষিপ্তভাবে বাইতুল মুকাররমে এসে জড়ো হয়েছি৷ জড়ো হওয়ার পর হাফেজ্জী হুজুর রাহ. উত্তর গেইট দিয়ে নামার চেষ্টা করছেন  আর পুলিশ বাঁধা দিচ্ছে। নামতে দিবে না৷ তখন একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাথে আমার সামনাসামনি হয়ে গেলে সে আসছিলো আমাকে ধরার জন্য৷ আমি কিছুটা পিছনে সরে আসলাম৷ তখন সাথীরা বলাবলি করতে লাগলো ‘তুকে ত ধরে নিয়ে যাবে। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম৷ কী করা যায়! তখন আমাদের কিছু সাথী সাথে করে শার্ট এবং লুঙ্গি নিয়ে আসছিলো। শার্ট লুঙ্গি পড়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়তে শুরু করি৷ এশার নামাজ পর্যন্ত পরে বাসায় চলে আসি৷ পরেরদিন আবার মাদরাসায় যাই। এটা আমার জীবনে খুব শিহরণ জাগে৷ বারবার মনে পড়ে।

 

ইসলাম টাইমস: আপনার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা কতটি?

মাওলানা নাসিম আরাফাত: প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা গণনা করা হয় না৷ তবে, ত্রিশের কম। পঁচিশ ছাব্বিশটা হবে৷

 

ইসলাম টাইমস: একজন আলেম হয়ে ইংরেজি শেখা বিষয়ক বই লেখার পেছনের গল্প কী? কেন  ইংরেজি নিয়ে কাজ করার উদ্যোগী হলেন?

মাওলানা নাসিম আরাফাত: ইংরেজি নিয়ে অনুপ্রেরণা বলতে পড়ালেখার  শুরু হয়েছে স্কুল দিয়ে। ওখানের একটা শিকড় আছে অন্তরে। আরেকটা বিষয় চিন্তা করে দেখেছি, আলেমরা  অনেক জ্ঞানী ও শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও কেউ কেউ তাদের অশিক্ষিত মনে করে। সাধারণ শিক্ষিত মহলে কোন আলেম যদি দু’চারটা ইংরেজি বলতে পারে তাহলে সবাই তাকে অনেক জ্ঞানী মনে করে  এবং তার মর্যাদা অনেক বেড়ে যায়। অথচ আমাদের আরবী ভাষা যতোটা কঠিন ঠিক ইংরেজি ভাষাটা ততো সহজ৷

তাই চিন্তা করলাম বর্তমান চাহিদা ও সময়ের দাবী হলো ফার্সী ভাষার বদলে ইংরেজিটা শেখা দরকার৷ আগেরকার সময় ফার্সী ভাষার দরকার ছিলো রাষ্ট্রের ভাষা উর্দু ছিলো। আন্তর্জাতিকভাবে ফার্সীর গুরুত্ব ছিলো। এখন ইংরেজি ভাষা আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত এবং ব্যাপকভাবে প্রচলিত৷ এই জন্য ছাত্ররা সহজে কীভাবে ইংরেজি ভাষা শিখতে পারে এই খেয়াল অন্তরে আসলো। চিন্তা করে দেখলাম এসো আরবী শিখি পড়ে ছাত্ররা সহজে আরবী ভাষাকে আয়ত্ত করতে পারে এবং বুঝতে পারে৷ তাই এসো আরবী শিখি-কে সামনে রেখে ইংরেজি ভাষাকে পেশ করার চেষ্টা করেছি৷ আর কিছু না৷

 

ইসলাম টাইমস: ‘সহজে ইংরেজি শিখব’ব্যতীত ইংরেজি ভাষা নিয়ে আর কোন কাজ করার ইচ্ছে আছে কি? সামনে ইংরেজি নিয়ে নতুন কোনো কাজ আসবে কি?

মাওলানা নাসিম আরাফাত: আমার তো আসলে ইংরেজির উপর তেমন দক্ষতা নাই৷ তারপরও হিম্মত করে লেখে কয়েকজন প্রফেসরকে দেখিয়েছি৷ এতে ভালো ফলাফল আসছে। আলহামদুলিল্লাহ।

আরেকটা বিষয় বেশ ক’বছর ধরে চিন্তা করছি, আরবী ইংরেজি আলাদা আলাদা আলাদা শেখার চেয়ে একসাথে শেখা যায় কিনা৷ যেমন, বাংলা বললাম সেটা আরবী করা৷ আরবী বললাম সেটা ইংরেজি করা৷ এভাবে দুটো ভাষা সমন্বয় করে শেখা যায় কিনা৷ আলহামদুলিল্লাহ, দুই বছর যাবত এটা নিয়ে গবেষণা করে কাজ করছি। নব্বই পৃষ্ঠার মতো পাণ্ডুলিপি হয়ে গেছে৷ পড়াচ্ছি৷ অল্প মেহনতে ছাত্ররা ইংরেজি আরবী এতো সুন্দর করে বলতে পারে যা আমার নিজেরও বিশ্বাস হয় না৷ আমি শুধুমাত্র একটা পথ দেখিয়ে দিয়েছি৷ পরবর্তীতে অনেকে আসবে৷ কাজ করবে।

 

ইসলাম টাইমস: মাদরাসার ছাত্রদের মধ্যে যারা সাহিত্য চর্চা করেন। লেখালেখি করেন তাদের প্রতি আপনার বিশেষ কোন পয়গাম আছে কি?

মাওলানা নাসিম আরাফাত: মাদরাসার ছাত্র যারা সাহিত্য চর্চা করে তাদের অনেককে পথ থেকে বিচ্যুতি হতে দেখা যায়।  যা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেখা যায়, সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে মাদরাসার লেখাপড়ায় অনেক দুর্বলতা আসে৷ নিজেকে একটু কবি ও সাহিত্যিক মনে করে আসল লেখাপড়ায় কমতি দেখা দেয়৷

সাহিত্য চর্চা করা দরকার দ্বীনের স্বার্থে। দ্বীনের জন্য৷ অনেকে এমন গল্প লিখেন যে গল্পের কোন বার্তা নাই৷ এমন গল্পের দরকার নাই৷ সাহিত্য চর্চাকে আমি মুরগীর মতো মনে করি৷ মুরগী যেমন অনেক কিছু খাওয়াদাওয়া করে৷ কিন্তু আমাদের যে ডিমটা উপহার দেয় সেটা অনেক মূল্যবান জিনিস৷ তেমনি সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে আমরা অনেক বই পড়বো৷ অনেকের বই পড়বো। কিন্তু সবকিছুর পেছনে আমাদের উদ্দেশ্য থাকবে ইসলাম। আমরা গল্প লিখবো কিন্তু গল্পের শেষ আহবান থাকবে ইসলামের দিকে৷ যা-ই করবো সব ইসলামের জন্য। সাহিত্যচর্চার পেছনেও আমাদের উদ্দেশ্য থাকবে ইসলাম।

যেহেতু ইসলামকে নিয়ে আমার চিন্তা-চেতনা এই জন্য ইসলামের আকীদা বিশ্বাস, নামাজ এবং কিতাবাদীতে বেশি মনযোগী হওয়ার পক্ষপাতী। ক্লাসে এক নম্বর হবো। বাকী সুযোগ হলে কোন একজন উস্তাদের পরামর্শে সাহিত্য চর্চা করবো। ছাত্র জীবনে সুযোগ না হলে ছাত্র জীবনের পর সাহিত্য চর্চার অফুরন্ত সময় থাকবে৷ তাই আগে ইসলামের ভীত মজবুত থাকবে।

সাহিত্য চর্চা একটা অতিরিক্ত ইলম। সুতরাং খেয়াল রাখতে হবে সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে আমার মূল ইলম যেন ভাটা না পড়ে।

 

পূর্ববর্তি সংবাদমেননের দু:খ প্রকাশ: নিজের বক্তব্যকে নিজেই ‘অতিশয় উক্তি’ আখ্যা দিলেন
পরবর্তি সংবাদরাসূলুল্লাহ সা:-কে সাহাবায়ে কেরাম যেমন ভালোবাসতেন