গাম্বিয়া, আবুবকর তামবাদু উভয়েই ইতিহাসে পাতায় ঢুকে গেলেন। রাখাইনে মিয়ানমারের গণহত্যার বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপ হচ্ছে গাম্বিয়ার আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা। গাম্বিয়া মিয়ানমারকে গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তাই শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সু চিকে গণতন্ত্র, মানবাধিকারের শিক্ষা দিচ্ছে গাম্বিয়া। অং সান সু চি যথারীতি সব জলাঞ্জলি দিয়ে গণহত্যার পক্ষে সাফাই গেয়ে যাচ্ছেন। আর এদিকে আবুবকর লজ্জায় ফেলে দিলেন মানবতার স্বঘোষিত অভিভাবক, আত্মীয়, মালিক ও সেবায়েতদের।
মিয়ানমারে বিরুদ্ধে মামলার মূল উদ্যোক্তা হচ্ছেন গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারবিষয়ক মন্ত্রী আবুবকর তামবাদু। অনেক দেশই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করতে পারত। কিন্তু সবাই যখন আহা-উহু করে, নিন্দা জানিয়ে বিষয়টি পার করে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই গণহত্যার মামলা করে গাম্বিয়া সবাইকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করল। আন্তর্জাতিক আদালতে রায় কী হবে, সেটা পরের বিষয়। কিন্তু গণহত্যার মামলা হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। এখন অন্তত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারকে গণহত্যাকারী বলা যাবে। আবুবকর প্রমাণ করে দিলেন, একজন ব্যক্তিই ইতিহাসে ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন।
পশ্চিম আফ্রিকার দরিদ্র এক দেশ গাম্বিয়া। জনসংখ্যা মাত্র ২০ লাখ। তিন দিকে সেনেগাল দিয়ে ঘেরা। আটলান্টিকের তীরে ছোট্ট উপকূল রয়েছে। ২০১৮ সালে ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ঢাকা বৈঠকে গাম্বিয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে শেষ মুহূর্তে বিচারবিষয়ক মন্ত্রী আবুবকর তামবাদুকে পাঠায়। আবুবকর ওআইসির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে গিয়ে গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবুবকর জানান, ‘রোহিঙ্গাদের প্রতিটি কথায় গণহত্যার কাহিনি লেখা আছে। আমি এখানে রুয়ান্ডার গণহত্যার সঙ্গে মিল খুঁজে পাই।’ রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার জন্য আবুবকর ওইআইসিতে প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং এই বছর ওআইসিকে মামলায় সহযোগিতা করতে সম্মত করেন। এভাবেই আবুবকর পশ্চিম আফ্রিকার এক ক্ষুদ্র দেশ গাম্বিয়াকে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সামনে নিয়ে আসেন।
শেষ পর্যন্ত মামলার ফলাফল যা-ই হোক, আবুবকরকে সময় মনে রাখবে। গাম্বিয়াকে সবাই মনে রাখবে। নির্যাতিতের পক্ষে, নিপীড়িতের সঙ্গে দাঁড়ানোর সুযোগ সময় করে দেয়। কিন্তু সেই সুযোগ সবাই গ্রহণ করতে পারে না। যাঁরা ঝুঁকি নিয়ে, দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে যান, ইতিহাসের পাতায় তাঁদেরই নাম লেখা হয়। গাম্বিয়ার মামলার পেছনে নানা কারণ খুঁজে বের করা যাবে। এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও সংযোগ থাকতে পারে। কেউ হয়তো গাম্বিয়াকে উসকাতেও পারে। কারও দ্বারা প্রভাবিত হলেও গাম্বিয়াকে, আবুবকরকে মানবতার পক্ষের বলেই ইতিহাস স্মরণ করবে। ইতিহাস তাঁদের মনে রাখবে এই কারণে যে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা পরিচালনার আর্থিক সক্ষমতা না থাকার পরও ‘তোমাদের দাবি আমাদের দাবি’ বলে রোহিঙ্গাদের রক্ষায় আবুবকর নামের এক আইনজীবী তাঁর দেশ গাম্বিয়াকে নিয়ে এগিয়ে এসেছিল।
ড. মারুফ মল্লিক, ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট অব অরিয়েন্ট অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব বন
প্রথম আলো থেকে নেওয়া
















