মক্কা বিজয়: মহানবীর মহানুভবতার উজ্জ্বল মিনার

উবায়দুল্লাহ তাসনিম।।

ঐতিহাসিক মক্কা বিজয় মানবেতিহাসের এক অবাক করা অধ্যায়৷ মক্কার তেরো বছরে কাফেররা নবীজি সা. কে কুৎসা রটনা, কবি, গণক, জ্যোতিষী ইত্যাদি কথায় কতই না মানসিক নির্যাতন করেছিল। তায়েফে শারিরিক নির্যাতন, মক্কায় তিনবছর বন্দী জীবন, হত্যার ষড়যন্ত্র, সবশেষে অশ্রুভেজা চোখে জন্মভূমি ত্যাগ। মক্কা বিজয়ের দিনটা ছিল ওসব কিছুর প্রতিশোধের মোক্ষম সময়। ‘শত্রুর ঘরে এসে শত্রুকে কচুকাটা’ এটা তখন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। রাসূল সা. ইচ্ছে করলেই পারতেন, রক্ত খেলা করতে। তার জন্য সুযোগ ছিল, মক্কার তেরো বছরের নিপীড়ন ও মদিনায় আসার পরও মক্কার কাফেরদের যেসব ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল, এর পূর্ণ প্রতিশোধ নিতে। কিন্তু না, তিনি তা করেননি৷ স্রোতের উল্টো চলেছেন। অন্য আর দশজন বিজয়ী শাসকের ক্ষেত্রে যে বিজয় উপাখ্যান শোনা যায়, তার বিজয় কাহিনী ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

অন্যদের মতো শত্রুকে নাগালে পেয়ে রক্ত খেলা নয়, প্রতিশোধ নয়, বরং  তিনি তার এই বিজয় অভিযানে কোন রক্ত ঝরাননি, প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেনি তার ভেতর। এ মহান বিজেতা সেদিন অসংখ্য এমন মানুষকেও ক্ষমা করেছেন, যারা তাকে কষ্ট দিতে সম্ভাব্য কোন পন্থাই বাদ রাখেনি।

একজন মহানুভব শাসকের দৃষ্টান্ত: দশ হাজার সাহাবায়ে কেরামের বিশাল জামাত নিয়ে রাসূল সা মক্কার পথে চলছেন। পথিমধ্যে আবু সুফিয়ানের সাথে দেখা। চোখাচোখি হলে নবীজি সা. চেহারা ফিরিয়ে নেন। চেহারা না ফিরানো এটা ছিল তার সামর্থ্যের বাইরে। অন্যান্য অনেকের মতো এই ব্যক্তিটিও কবিতা রচনা করে প্রিয় নবীজি সা কর কষ্ট দিয়েছে৷ আবু সুফিয়ান এই বিমুখতার ব্যাপারটা আলী রা এর নিকট অভিযোগ করলে তিনি বলেন, তুমি রাসূল সা. এর সামনে হাজির হয়ে ঠিক সেরকম বল, যেরকম বলেছিল ইউসুফ আ. এর ভাইয়েরা, تا لله لقد آثرك الله علينا وإن كنا لخطئين ‘আল্লাহর ক্বসম! আল্লাহ তোমাকে আমাদের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আর নিশ্চয় আমরাই ছিলাম অপরাধী।’ (ইউসূফ, ৯১) হলোও তাই। রাসূল সা. এর নিকট গিয়ে এরকম কাঁচুমাচু হয়ে বলার পর তিনি যে কথা বলেছিলেন, তা হয়তো আবু সুফিয়ান কোনদিনও ভাবেননি। রাসূল সা. বলেন, لا تثريب عليكم اليوم يغفر الله لكم وهو ارحم الراحمين ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই৷ আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি দয়াশীলদের মাঝে মধ্যে সবচে সেরা দয়ালু৷'(ইউসূফ, ৯২) আবু সুফিয়ান তখন তার এই মহানুভায় ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু সুফিয়াকে ক্ষমার সাথে সাথে ব্যাপকভাবে সবার জন্য এক বিরাট ক্ষমা ঘোষণা করেন রাসূল সা.।

নবীজি সা এখনো মক্কায় প্রবেশ করেননি। আবু সুফিয়ান দৌড়ে গিয়ে মক্কার উপকণ্ঠে দাঁড়িয়ে এই ব্যাপক ক্ষমতার কথা সবাইকে জানান।

মক্কা বিজয়ের দিন এক ব্যক্তি রাসূল সা. এর সাথে কথা বলতে গিয়ে থরথর করে কাঁপছিল। প্রিয় নবীজি সা. তাকে অভয় দিয়ে বললেন, তুমি ভয় পেয়ো না। আশ্বস্ত হও। আমি কোন বাদশাহ নই৷ আমি এমন এক কুরাইশ মহিলার সন্তান, যিনি গোশতের শুকনো টুকরা খেতেন। (বুখারি, কিতাবুর মাগাযি)

কাবার চাবি: রাসূল সা. মক্কায় ঢোকার পর কাবা শরিফের তওয়াফ করলেন। তওয়াফ শেষে উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে তার হাত থেকে চাবি নিয়ে তিনি কাবা শরিফের দরোজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন৷ এই উসমানের কাছে হিজরতেরও আগে যখন নবীজি সা. চাবি চাইলেন, তখন তিনি চাবি দেননি৷ রূঢ় ভাষায় নবীজি সা.কে উত্তর দেন এবং অসম্মানজনক কথা বলেন। তখন নবীজি সা. বলেছিলেন, একদিন তুমি এই চাবিটি আমার হাতে দেখতে পাবে৷ সেদিন আমি যাকে ইচ্ছা তাকে দিবো। তখন উসমান ইবনে তালহা আশংকা প্রকাশ করে বলছিলেন, বাস্তবে এমন হলে সেদিন কুরাইশদের জন্য খুবই লাঞ্চনার ব্যাপার হবে।

নবীজি বললেন, না, সেদিনটা হবে প্রতিষ্ঠা ও সম্মানের৷ একদিন বাস্তবে যে এমনটা ঘটবে, এ ব্যাপারে উসমানের কোন সন্দেহ ছিল না। এবং কথাটা তার অন্তরে গেঁথে যায়৷ বাস্তেই আজ সেই কথাটার প্রতিফলন ঘটতে যাচ্ছে। কাবা শরিফ থেকে বের হবার পর চাবির জন্য আলী রা. আবেদন করেন। কিন্তু তিনি সেই আবেদনে সাড়া না দিয়ে জানতে চান, উসমান কোথায়?

উসমান আসলে তার হাতে নবীজি সা. চাবি দিয়ে বলেন, উছমান! এই নাও তোমার চাবি। আজ উত্তম ব্যবহার ও বিশ্বস্ততা দেখানোর দিন। এই নাও চাবি। এই চাবি তোমাদের কাছেই থাকবে। একমাত্র জালিম ছাড়া অন্য কেউ তা তোমাদের কাছ থেকে নিতে পারবে না৷ (যাদুল মাআদ, ১,৪২৫ তাবকাতে ইবনে সাআদের বরাতে)

ঐতিহাসিক ভাষণ ও মহানুভতার পাঠ: রাসূল সা যখন কাবার ভিতরে, তখন কুরাইশ কাফেররা কাবার চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে। সবাই ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে৷ কি সিদ্ধান্ত আসে বলা যায় না। এতদিন তার সাথে কতো নিষ্ঠুর আচরণ করেছে তারা! আজকে কি তিনি ক্ষমা করবেন? নবীজি সা খানিকপর বের হলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে নবীজি সা এক ভাষণ দিলেন, ‘এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই, তিনি এক তার কোন শরিক নেই। তিনি তার ওয়াদাকে সত্যে পরিণত করেছেন। …এরপর সবাইকে সম্বোধন করে বললেন, কুরাইশের লোকেরা! তোমরা কী আশা করছ, এখন আমি তোমাদের সংগে কিরূপ ব্যবহার করবো? তারা জবাব দিল, আমরা তোমার নিকট উত্তম ব্যবহার পাবার আশা করি। তুমি হৃদয়বান। তুমি আমাদের সম্ভ্রান্ত ভাই ও ভাতিজা। তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে তাই বলছি, যা ইউসুফ আ তার ভাইদের বলেছিলেন, لا تثريب عليكم اليوم اذهبوا فأنتم الطلقاء ‘তোমাদের বিরুদ্ধে আজ আমার কোন অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা মুক্ত।’

পূর্ববর্তি সংবাদআ.লীগ নেতার ইট ভাটা থেকে শিকলে বাঁধা দুই শ্রমিক উদ্ধার
পরবর্তি সংবাদমারা গেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান