এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আবার আমাদের ফিরে তাকাতে হয় সিরিয়া-রাশিয়া ঐতিহাসিক সম্পর্কের দিকে। গত কয়েক দশ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক ওঠানামা করেছে, করেনি কেবল সিরিয়ার সাথে। এ দু’ দেশের সম্পর্ক ছিল স্থির, অটুট। সিরিয়ার তারতৌস সমুদ্র বন্দরকে বলা হয়, স্নায়ুযুদ্ধের একটি স্মৃতি। ভূমধ্যসাগরে প্রবেশের এটিই একমাত্র পথ। যাহোক, সিরিয়ায় বাশারের শাসনকে টিকিয়ে রাখতে পুতিন যখন সেদেশের গৃহযুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ করলেন অর্থাৎ বাশারের পক্ষে সেনা পাঠালেন, তার পর থেকেই তার হিসাবনিকাশ পাল্টে যেতে থাকলো। রাশিয়া স্থির করলো মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাবের দিগন্তকে অনেক দূর নিয়ে যেতে হবে, কেবল সিরিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এটা করতে হবে ওই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে – কখনও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে, কখনও মধ্যস্থতার নামে, আবার কখনও বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে। সিরিয়াকে ব্যবহার করে ওই অঞ্চলে প্রবেশের কাজে পুতিন মোটামুটি সফলই হয়েছেন বলা যায়। তবে এ কৌশলগত উচ্চাভিলাষ হাসিলের প্রথম এবং সবচাইতে কার্যকর হাতিয়ার হচ্ছে, অভিযান চালানোর জন্য একটি স্থায়ী ঘাঁটি এবং সিরিয়ায় একজন বিশ্বস্ত মিত্র।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বাশার এখন পর্যন্ত টিকে আছে রাশিয়ার সাহায্য নিয়েই। বিরোধীরা যেইমাত্র দমন হবে, বাশারের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আবার দেশের ভেতরের দিকে নজর দেবে, শুরু করবে নির্যাতন-নিপীড়নের নতুন অধ্যায়। যুদ্ধ যেইমাত্র বাশারের পক্ষে মোড় নিতে শুরু করলো, অমনি দেশটিতে ফিরতে দেখা গেলো ‘সেই ট্র্যাডিশন’ – দুর্নীতি, বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদ ও নিপীড়ন। দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মূলত এসব অনাচার উৎখাতের লক্ষ্যেই। ফলে নতুন করে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা, যা খুলে দিচ্ছে অনিশ্চয়তার দরজা।
বেড়ে চলেছে দুর্নীতিও। দেশটিতে গজিয়েছে ‘মুনাফাবাজ’ একটি গোষ্ঠী। সরকারি সংস্থাগুলোকে উপেক্ষা করে ‘চোরাচালানি ও মিলিশিয়ারা’ অবাধে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। জায়গায় জায়গায় গড়ে উঠেছে যুদ্ধবাজ নেতা, যারা সিরিয়া সরকারকে থোড়াই কেয়ার করছে।
এসব ঘটনা থেকে পুতিন বুঝতে পারছেন, দেশের ওপর থেকে বাশারের কর্তৃত্বের মুঠো শিথিল হয়ে আসছে। রাশিয়া সাহায্য দিয়েও তাকে আর বেশিদিন টেকাতে পারবে না। এই বাশারকে নিয়ে রাশিয়া তাহলে কী করবে?
এছাড়া বাশারের একগুঁয়েমিও বেশ বিরক্ত করেছে পুতিনকে। গত মার্চ মাসে ইদলিবে তুরস্কের এক প্রতিশোধমূলক ড্রোন হামলায় বাশার বাহিনীর কয়েক হাজার সৈন্য নিহত হয়। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুতিন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের সাথে বৈঠক করে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত করান সিরিয়া ও তুরস্ক উভয় পক্ষকে। এর ফলে বাশার বাহিনী বড় একটি যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়। এর এক সপ্তাহ না-যেতেই বাশারের বাহিনী হামলা চালায় ইদলিবে, যেখানে তুরস্কের কয়েকটি অবজারভেশন পোস্ট রয়েছে। শোনা যায়, সংযুক্ত আরব আমীরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদের কাছ থেকে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার পেয়ে সিরিয়া এ অভিযান চালিয়েছে। সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে প্রেসিডেন্ট বাশারের এমনতর উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সাথে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সম্পর্ককে ক্রমেই তিক্ত করে তুলছে। অথচ ওই অঞ্চলে রাশিয়ার প্রভাববলয় বিস্তারের জন্য এরদোগানকে খুবই প্রয়োজন পুতিনের।
এদিকে সিরিয়া ও ইরান রাশিয়ার বন্ধু বটে, তবে তারা রাশিয়ার জন্য বেশ ঝামেলাও তৈরি করে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়া ও ইরান দু’ দেশই যদিও প্রেসিডেন্ট বাশারের পক্ষে, কিন্তু উভয়ের মধ্যে আবার অন্তঃদ্বন্দ্বও আছে। যুদ্ধপরবর্তী সিরিয়ার ভাগ্য কি হবে, তা নিয়েই এ দ্বন্দ্ব। ২০১৯ সালে এ দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়, যখন সিরিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইরানের প্রভাব বিস্তারের পাল্টা ব্যবস্থা নিতে থাকে রাশিয়া। সিরিয়া সরকারের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ পুনর্গঠনের চেষ্টায় কয়েক বছর অতিবাহিত করার পর পুতিন `যুদ্ধবাজ নেতা’ সুহাইল আল-হাসানের টাইগার ফোর্সকে লেলিয়ে দেন মাহের আল-আসাদের ইরানঘেঁষা ফোর্থ মেকানাইজড ডিভিশনের বিরুদ্ধে। পুতিনের এ চেষ্টা যদিও সফল হয়নি, তবে মাহেরকে হটিয়ে দেয়ার এ চেষ্টার মধ্য দিয়ে একটি প্রতীকী বার্তা দেয়া গেছে। তা হলো, বাড়াবাড়ি করলে কাউকেই ছাড়া হবে না। বলে রাখা ভালো যে, মাহের আল-আসাদ হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ছোট ভাই এবং মাহেরের ক্ষমতার শক্ত খুঁটি হচ্ছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
দেশে প্রেসিডেন্ট বাশারের কর্তৃত্ব ক্ষীণ হয়ে আসার সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সিরিয়ায় অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইরানী মদদপুষ্ট মিলিশিয়া বাহিনী। রাশিয়া চেয়েছিল, ওদের সামরিক বাহিনীতে আত্মীকরণের মাধ্যমে বাগে আনতে। কিন্তু ওই চেষ্টা অংশত বিফলে গেছে। স্বাধীনভাবে কাজ চালানোর বর্তমান অধিকার হারিয়ে ফেললে মিলিশিয়ারা আবার নতুন কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে – এমন আশঙ্কায় ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি রাশিয়া ও ইরান দু’ দেশই। ফলে পুতিনের উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়। তাছাড়া সিরিয়ায় রাশিয়া এমন কোনো ‘ক্লায়েন্ট’ পেতে চাইবে না, যে কিনা পুরো দেশের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পারবে না। রাশিয়া যে সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের কথা বার বার বলে চলেছে, পরিহাসের বিষয় হলো, সেটা আসলে সিরিয়াকে নিজের প্রভাববলয়ে রাখার মনোবাসনারই প্রকাশ বৈ আর কিছু নয়।
সবকিছুকে যোগ-বিয়োগ করে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার যে পরিকল্পনা মনে মনে আঁটছে মস্কো, তা বাস্তবায়নের আর খুব বেশি দিন বাকি নেই। বাশার ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের সরিয়ে দিয়ে সিরিয়ায় একটি নতুন শাসকগোষ্ঠী বসানোর মধ্য দিয়ে দেশটিকে তাবেদার রাষ্ট্র বানানোই লক্ষ্য রাশিয়ার, যে দেশ উঠবস করবে রাশিয়ার কথায়, আর কারো কোনো কথা সেখানে খাটবে না। আর সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তন হলে দেশটি পুনর্গঠনের জন্য পশ্চিমা সাহায্য আসায়ও আর কোনো বাধা থাকবে না। প্রেসিডেন্ট বাশারের সরকার ক্ষমতায় থাকায় পশ্চিমা দেশগুলো সিরিয়াকে সাহায্য দেয়া অনেক বছর ধরে বন্ধ রেখেছে।
রাশিয়া যে আর বাশারের পেছনে থাকতে চাচ্ছে না, তা পরিষ্কার হয়ে যায় গত এপ্রিল মাসে সে-দেশের সরকারঘনিষ্ঠ একটি মিডিয়া আউটলেটে প্রকাশিত তিন পর্বের এক ধারাবাহিক প্রতিবেদনে। এতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসদকে ”দুর্নীতিপরায়ণ, দুর্বল ও অযোগ্য” বলে বর্ণনা করা হয়। প্রতিবেদনে ”সিরিয়ায় পরিচালিত” এক জরিপের কথা উল্লেখ করে ২০২১ সালের সম্ভাব্য নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট বাশার জয়ী হতে পারবেন না বলেও ঘোরতর সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। এ থেকে বোঝাই যায়, রাশিয়া চাচ্ছে বাশার তাদের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলু, কিন্তু বাস্তবে সেটি হচ্ছে না। প্রতিবেদনে এ নিয়ে রাশিয়া যে অসন্তুষ্ট, তা-ই ফুটে উঠেছে। এছাড়া অন্য অনেক সূত্রই নিশ্চিত করেছে যে, বাশারকে ক্ষমতাচ্যূত করার বিষয়ে রূশ জনগণকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার কাজও চালিয়ে যাচ্ছে ক্রেমলিন।
তবে সিরিয়ার ক্ষমতা থেকে বাশার আল আসাদকে উৎখাতে রাশিয়াকে আরো অনেক ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিতে হবে। সব অঙ্ক মিললেই সামনে এগোবে রাশিয়া। সময়ই বলে দেবে, রাশিয়া অর্থাৎ তাদের নেতা পুতিন আসলে কী করবেন আর প্রেসিডেন্ট বাশারের ভাগ্যেই বা কী ঘটতে যাচ্ছে। তবে এটা তো স্পষ্ট যে, বাশার ক্রমেই তার শক্তির উৎসগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন আর তার হাতে খেলার মতো কোনো কার্ডই অবশিষ্ট থাকছে না।