দেড়শ বছরের ইতিহাস আর ৩৫ বছরের ‘লড়াই’ শেষে নির্মিত এথেন্সের সেই মসজিদটি খুলবে কবে?

এথেন্সের একটি মসজিদ

মুহাম্মাদ শোয়াইব ।।

সম্প্রতি ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে মসজিদ নির্মাণের ব্যাপারে চলমান এক বিতর্কের ওপর ব্যাপক আলোকপাত করা হয়। গ্রিক ইতিহাসের বিগত প্রায় দেড়শ বছর পর প্রথম বারের মতো মসজিদ নির্মাণের অনুমতি মেলে ২০১৬ সালের অক্টোবরে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইবাদতের জন্য তখন গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিল দেশটির পার্লামেন্ট।

ক্ষমতাসীন বামপন্থী সরকারের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সি সিপরাস নতুন মসজিদের জায়গা বাছাই করেছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন জোটের মধ্যে সিরিজা পার্টি বিলের পক্ষে ভোট দিলেও বিরোধিতা করেছিল ইন্ডিপেন্ডেন্ট গ্রিকস পার্টি। শেষ পর্যন্ত ২৩০ আসনের পার্লামন্টে দুইশর বেশি ভোট পেয়ে মসজিদ নির্মাণের বিলটি পাস হয়েছিল। এখানে ৩৫০ পুরুষ ও ৫০ নারীর জন্য নামাজ আদায়ের বন্দোবস্ত রাখা হয়েছিল।

লেখক : মুহাম্মদ শোয়াইব

এথেন্সের প্রায় আড়াই লক্ষ মুসলমানের ৩৫ বছরের ‘লড়াই’ ও দাবির প্রেক্ষিতে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু গ্রিক সংসদের অনুমোদনের পর মসজিদটি নির্মিত হলেও দুই বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম হলো- এখনও মসজিদটি নামাজের জন্য খুলে দেয়া হয়নি।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, এই মসজিদ নির্মাণের পথে বিরোধী রক্ষণশীল ন্যাশনালিস্ট পার্টি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইনডিপেনডেন্ট গ্রিকস অথবা এএনইএলের সঙ্গে বামপন্থী সিরিজা দলের ক্ষমতার ভাগাভাগি রয়েছে। এএনইএলের সাংসদেরা মসজিদ নির্মাণসংক্রান্ত আইনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল।

এথেনীয় মুসলিম কমিউনিটির নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে কখন মসজিদের উদ্বোধন হবে, তা নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলেন। মসজিদ নির্মাণ নিয়ে এই সংকটের কারণে এথেন্সে মুসল্লিরা বেসমেন্টে, গ্যারেজে, বাড়িতে খোলা জায়গায় ইবাদত করে আসছিলেন।

সম্প্রতি দীর্ঘ দিনের বিলম্বের পর আগামী এপ্রিলে এথেন্সের নিওস কসমস শহরে নির্মিত মসজিদটি খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। তিনি বলেন, ‘ভবনটি পূর্ণ প্রস্তুত, কিন্তু আশপাশের এলাকায় আরও কিছু সংস্কারের কাজ বাকি আছে’।

পত্রিকাটি বলছে, এথেন্সের মুসলিম নাগরিকরা বিগত দেড়শ বছরে আজ পর্যন্ত তাদের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি জায়গাও পায়নি। তারা ভেবে নিয়েছে যে, এথেন্স সরকার তাদের সঙ্গে আসলে নাগরিকের ন্যায় আচরণ করছে না। এখন আবার মুসজিদ খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর চরম ডানপন্থীরা মসজিদটি নির্মাণ করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে প্রতিবাদ মিছিল করে এবং মসজিদের দেয়ালে নানা বর্ণবাদী স্লোগান লিখে রাখে।

তবে শহরে ববসাসরত মুসলিমরা এখনও সংশয়ের মধ্যেই আছেন। তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না, মসজিদটি তাদের জন্য খুলে দেয়া হতে পারে কি না। তারা এখনও নিজেদের ঘরে, দোকানপাট ও গাড়ির গ্যারেজে নামাজ আদায় করছেন। এথেন্সের এই মসজিদটি নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘকাল বিতর্ক চলে আসছিল। তবে মসজিদ নির্মাণের প্রথম পরিকল্পনা আসে ১৯৮০ সালে। গ্রিসবাসীর বেশির ভাগই অর্থোডক্স খ্রিস্ট্রধর্মাবলম্বী। ১৯২৩ সালে খ্রিস্টান-মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিনিময় চুক্তি অনুসারে গ্রিসের বেশির ভাগ মুসলিম ধর্মাবলম্বী তুরস্কে চলে যান। খ্রিস্টানরা থেকে যায় গ্রিসে। জনগোষ্ঠী বিনিময় চুক্তি হওয়ার পর ১৯৩৪ সালে ও ২০০৪ সালে এথেন্সের অলিম্পিকের আগেও বেশ কয়েকবার মসজিদ নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সেগুলোর কোনোটিই কাজে আসনি।

এথেন্সের পুরোনো অংশে ঐতিহাসিক দুটি ছোট মসজিদ রয়েছে। অটোমান যুগ থেকেই সেগুলোর ব্যবহার ছিল না। এথেন্স ও বন্দরনগরী পাইরিসে শত শত মুসলিম জনগোষ্ঠী বসবাস করে। এই জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই মিসরের আরব বংশোদ্ভূত। এ ছাড়া তাদের অনেকেই মিসরের নিকটবর্তী লেভান্ত এলাকার বাসিন্দা। আফগানিস্তান, দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকার এই অভিবাসীরা ১৯৭০ সালে গ্রিসে এসে পৌঁছান।

গ্রিসের মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের মিসরীয় বংশোদ্ভূত প্রেসিডেন্ট নাইম আল-গুন্দুর বলেন, তার মতো দীর্ঘদিন ধরে যারা এখানে রয়েছেন, সেই মুসলিমদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের সুসম্পর্ক রয়েছে। তবে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এভাবে প্রার্থনা করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গুন্দুর বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, আমি গ্রিসের বাসিন্দা, গ্রিসের স্কুলে পড়াশোনা করি, আমার আর কোনো দেশ নেই। তাহলে কেন আমাকে বেসমেন্টে নামাজ আদায় করতে হবে? যেখানে আমার প্রতিবেশীরা চার্চে যেতে পারে?’ তাদের এসব প্রশ্ন যৌক্তিক মনে করেন গুন্দুর।

অবশ্য নানা সুবিধা-অসুবিধা থাকলেও গ্রিসে ইসলামের প্রসার বাড়ছে। অনানুষ্ঠানিকভাবেই এথেন্সের বিভিন্ন জায়গায় নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা। পত্রিকাটি বলছে, এথেন্স মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান নাঈম আল গুন্দুর, যিনি একজন ব্যবসায়ী ও তার স্ত্রী আনা স্টামু বলেন, বছরের পর বছর ধরে মসজিদ সম্পর্কে রাজনীতিবিদদের উপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন তারা।

নাঈম বলেন: “আমার শিশু গ্রিক সন্তানদের সঙ্গে একসঙ্গে স্কুলে, ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করে, এক সঙ্গে খেলাধুলা করে; কিন্তু যখন নামাজের সময় হয়, তখন তারা গির্জায় যায় আর আমাদের সন্তানদেরকে নামাজ আদায় করতে মাটির নিচে গাড়ির গ্যারেজে যেতে হয়। এতে প্রমাণিত হয়, মুসলিমরা তাদের নাগিরত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদেরকে নাগরিক হিসেবে সমান চোখে দেখা হচ্ছে না।
উল্লখ্য, নাঈম আল গুন্দর ১৯৭৪ সাল থেকে এথেন্সে বসবাস করছেন।

পত্রিকাটি আরও জানাচ্ছে, মসজিদ উদ্বোধন-উদ্যোগ ব্যাপক ও শক্তিশালী বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। কারণ বিরোধী পার্টির যারা ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত এবং পার্লামেন্টে ১৫ আসনের অধিকারী তারা এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিবাদ মিছিল বের করেছে। দাবি করা হয়ে থাকে, সাম্প্রতিক সময়ে তারা শরণার্থীদের বিরুদ্ধেও নিষ্ঠুর হামলা চালিয়েছে। বিষয়টি জাতিসংঘ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনেও তথ্যেও উঠে এসেছে।

সূত্র: আরাবি ২১, আরাবি পোস্ট ও ইসলাম নিউজ

পূর্ববর্তি সংবাদসুইডিশ নারী ফুটবলারের ইসলাম গ্রহণ
পরবর্তি সংবাদসারা দেশে তীব্র প্রতিবাদের মুখেও পঞ্চগড়ে হচ্ছে কাদিয়ানি ইজতেমা!