ভারত-পাকিস্তানে ইসলামি ধারার গণমাধ্যম ও আমাদের দীনতা

জহির উদ্দিন বাবর ।।

২০১৮ সালের মার্চের কথা। ভারত সফরকালে দারুল উলুম দেওবন্দেও যাওয়ার সুযোগ হয়। ফজরের নামাজের পরপরই হজরত মাওলানা সাইয়েদ আরশাদ মাদানি দা.বা.-এর সঙ্গে দেখা করলাম মসজিদে রশিদে। তিনি আমাদেরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে দেখা করতে আসা বেশ কয়েকজনকে নিয়ে গেলেন নিজ বাসায়। সবাইকে নিয়ে বসলেন নাস্তার দস্তরখানে। সবাই তৃপ্তি সহকারে নাস্তা সারলাম। তখনও সাতটা বাজেনি। এর আগেই তাঁর সামনে হাজির বেশ কয়েকটি পত্রিকা। বেশির ভাগই উর্দু। আছে হিন্দি ও ইংরেজিও। তিনি একে একে চোখ বুলালেন পত্রিকাগুলোর ওপর। কয়েকটি পত্রিকায় তাঁর নিজের খবরও এসেছে। তিনি এখন ভারতীয় মুসলিমদের অভিভাবকতুল্য মুরব্বি। মুসলমানদের পক্ষে জাতীয় পর্যায়ে কথা বলার ক্ষেত্রে তাঁর মতো ফিগার খুব কমই আছে।

একটু পরই হাদিসের দরসে বসবেন। সাধারণ কোনো মসনদ নয়, বিশ্ববিখ্যাত দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের হাদিসের মসনদ! এর আগে দেশ ও জাতির খবর নিচ্ছেন দৈনিক পত্রিকা পড়ে! জানতে পারলাম প্রতিদিন তিনি বিবিসির সংবাদ শোনেন। প্রতি মুহূর্তের খবর রাখেন। দেওবন্দের শীর্ষ এই মুরব্বির এমন যুগসচেতনতা দেখে আমরা সত্যিই বিস্মিত হলাম। আমাদের দেশে যেখানে অনেক জায়গায় পত্রপত্রিকা পড়াকে অনেকটা ‘বুজুর্গি পরিপন্থি’ কাজ মনে করা হয় সেখানে এতো বড় একজন বিশ্ববিখ্যাত আলেম দিনের শুরুতেই একাধিক পত্রিকা পড়ে নিচ্ছেন! খবর নিয়ে জানতে পারলাম, দেওবন্দের অনেক সচেতন উস্তাদই এভাবে নিয়মিত খবরের কাগজ পড়েন। কোথায় কী ঘটছে সেটা তাদের নখদর্পণে থাকে।

আসলে দেশ, জাতি ও বিশ্বের খবরের সঙ্গে থাকা প্রতিটি সচেতন আলেমের জন্যই জরুরি। সংবাদপত্র পড়া তো দূরের কথা একটা দীর্ঘ সময় আমাদের দেশের আলেম-উলামা বাংলা চর্চাই করতেন না। যদিও এখন পরিস্থিতি আমূল পাল্টে গেছে। এখন সচেতন আলেমদের অনেকেই প্রতিমুহূর্তে সংবাদের সঙ্গে থাকেন। মোবাইলে ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদের ওপর আমাদের অনেকের নির্ভরতা বেড়েছে। আবার অনেকেই কাগজের পত্রিকা না পড়লে তৃপ্ত হন না। সবমিলিয়েই একটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে আমাদের অঙ্গনে।

গত পাঁচ সাত বছরে দেশে অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। ব্যাপক হারে জন্ম নিয়েছে অনলাইন নিউজপোর্টাল। যদিও এগুলোর বেশির ভাগেরই নেই কোনো পেশাদারিত্ব। তবে মানুষ এখন কাগজের পত্রপত্রিকার চেয়ে অনেকটা পোর্টালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। এজন্য প্রতিটি দৈনিক সংবাদপত্রই তাদের অনলাইন ভার্সন গতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছে। হাজার হাজার নিউজপোর্টালের মধ্যে গত কয়েক বছরে ইসলামি ধারার বেশ কয়েকটি অনলাইন নিউজপোর্টাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আশার দিক। লাখ লাখ আলেম-উলামা, মাদরাসার শিক্ষার্থী এবং দীনদার পাঠকের অনলাইনের খোরাক যোগানোর জন্য এগুলোও যথেষ্ট নয়, আরও হওয়া দরকার। তবে নিছক হওয়ার জন্য হওয়া নয়, একটু মানসম্মত হওয়া চাই। ন্যূনতম পেশাদারিত্ব থাকা উচিত। শুধুই বুঝে না বুঝে কপি আর পেস্টনির্ভর পোর্টাল হাজারটা হলেও খুব বেশি প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।

আমাদের দেশে সাধারণ ধারার সংবাদপত্র এবং গণমাধ্যমের যতটা উত্তরণ হয়েছে তার ছিঁটেফোঁটাও হয়নি ইসলামি ধারার সংবাদপত্রে। ইসলামি ধারার গণমাধ্যম হতে পারে-সেই ধারণাটা জন্মাতেও লেগেছে অনেক বছর। অনেক সংবাদপত্র ইসলামের নাম ব্যবহার করে কিংবা ইসলামপন্থিদের টানার জন্য ইসলামি হওয়ার ভান করেছে বটে, তবে সুস্থ ও রুচিশীল ইসলামি ধারার গণমাধ্যম হয়ে ওঠেনি। সময়ের প্রেক্ষাপট পাল্টে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে গণমাধ্যমের ধরণও। একটা সময় একটি দৈনিককেই মনে করা হতো শক্তিশালী গণমাধ্যম। কিন্তু এখন দৈনিকের আবেদন অনেকটাই ম্রিয়মান হয়ে গেছে অনলাইন পোর্টাল, স্যাটেলাইট টেলিভিশন আর এফএম রেডিও’র কাছে। এখন কে কত আগে খবর দিতে পারবে এর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এই প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে সময় উপযোগী সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।

দুই.

আমাদের দেশের ইসলামি ধারার সংবাদমাধ্যমটা বিকশিত হয়নি। দৈনিক তো দূরের কথা মোটামুটি মানের একটি সাপ্তাহিকও নেই এদেশের ইসলামপন্থিদের। অথচ আমাদের পাশের দেশ ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করতে গেলে এক্ষেত্রে অনেকটা হতাশ হতে হয়। সেখানকার মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে বিকশিত হয়েছে ইসলামি ধারার গণমাধ্যমও। ভারত হিন্দুপ্রধান দেশ হলেও সেখানে মুসলিমদের আনুকূল্য দেয়ার মতো অনেকগুলো সংবাদমাধ্যম আছে। ভারতের মুসলিমরা সেখানে যে খুব ভালো আছে তা তো নয়, কিন্তু গণমাধ্যমের মালিকানার ক্ষেত্রে তাদের মোটামুটি ভালো অবস্থান রয়েছে। রাজধানী দিল্লিসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে অনেকগুলো উর্দু সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এগুলো মূলত মুসলিম মালিকানাধীন। ইসলামের প্রতি দরদ থেকে সংবাদপত্র করেছে এমন না, তবে যেহেতু সেখানে মুসলমানরা সংখ্যালঘু এজন্য তাদের পক্ষে কথা বলে পত্রিকাগুলো। তাছাড়া সেখানকার উর্দু পত্রিকাগুলোতে আলেম-উলামার যথেষ্ট উপস্থিতি রয়েছে। অন্তত বাংলাদেশের চেয়ে অনেক গুণ বেশি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয় প্রভাবশালী পত্রিকা ‘রোজনামায়ে সেহাফত’। এর মুম্বাই ও লক্ষ্মৌ সংস্করণ বের হয়। পত্রিকাটিতে সাধারণত মুসলমানদের খবরাখবর গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে ইসলামি কর্মতৎপরতার খবর ফলাও করে প্রচার করে। এর সম্পাদক আমান আব্বাস।

হায়দারাবাদ থেকে বের হয় উর্দু দৈনিক ‘ইতেমাদ’। এতেও মুসলমানদের খবর প্রাধান্য পায়। মুম্বাই থেকে প্রকাশিত হয় ‘উর্দু টাইমস’। ১৯৬০ সাল থেকে চলছে পত্রিকাটি। প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ নজির। বেশ প্রভাবশালী পত্রিকা এটি। হায়দারাবাদ থেকে বের হয় ‘ডেইলি সিয়াসত’। ১৭ বছর ধরে পত্রিকাটি বের হচ্ছে। ‘রোজনামায়ে সাহারা’ বের হয় দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা, হায়দারাবাদ, লক্ষ্মৌ, ব্যাঙ্গালুরু, পাটনা, গোরাখপুর ও কানপুর থেকে। প্রচারসংখ্যাও ভালো। প্রভাবও অনেক।

‘ইনকিলাব উর্দু’ বের হয় মহারাষ্ট্র, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ ও বিহার সংস্করণে। প্রভাবশালী পত্রিকা ‘হিন্দুস্তান এক্সপ্রেস’ একযোগে বের হয় দিল্লি ও পাটনা থেকে। এতে মুসলিমদের সংবাদ বিশেষ গুরুত্ব পায়।  ‘রোজনামায়ে আগ’ প্রকাশিত হয় লক্ষ্মৌ থেকে। সম্পাদক আকবর আলি। আর হায়দারাবাদ থেকে বের হয় ‘রোজনামায়ে মুনসিফ’। প্রচার সংখ্যায় প্রথম সারির একটি পত্রিকা। এছাড়া কাশ্মিরে উজমা, তামিরে এরশাদ, কওমি তানজিম, রোজনামায়ে সাহারা, হিন্দ সমাচার, মুম্বাই উর্দু নিউজ, আখবারে মাশরিক, মেরা ওয়াতন, হিন্দ নিউজ, জাদিদ খবর, রাবেতা টাইমস, রোশনি, সদায়ে হুসাইনি-সবগুলো পত্রিকাই উর্দুতে প্রকাশিত হয় এবং মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় প্রাধান্য পায়। দিল্লি থেকে বের হয় সাপ্তাহিক ‘নয়ে দুনিয়া’। প্রধান সম্পাদক শহীদ সিদ্দিকী। এটিও একটি প্রভাবশালী গণমাধ্যম। এখানে আলেম-উলামার সংবাদ বিশেষ গুরুত্ব পায়।

আমাদের পাশের বাড়ি কলকাতা। সেখানকার মুসলমানরা যে খুব ভালো আছে তা কিন্তু নয়। সেখানকার মুসলমানদেরও দৈনিক পত্রিকা আছে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ‘আওয়ামি নিউজ’ ও ‘আবশার’ নামে উর্দু পত্রিকা। এছাড়া প্রভাবশালী পত্রিকা সাহারার একটি সংস্করণ বের হয় কলকাতা থেকে।

ইসলামি ধারার প্রভাবশালী গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নজির স্থাপন করেছে পাকিস্তানি আলেমরা। পাকিস্তানের প্রখ্যাত মুফতি রশিদ আহমদ দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘রোজনামায়ে ইসলাম’-এর প্রতিষ্ঠাতা। পত্রিকাটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এতে কোনো প্রাণীর ছবি ব্যবহার করা হয় না। এই সময়ে এসেও ছবি ছাড়া পত্রিকা বের করা যায় সেটা রোজনামায়ে ইসলাম করে দেখিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া মুফতি রশিদ আহমদ প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক জরবে মুমিনও ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষের প্রভাবশালী পত্রিকা। পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী পত্রিকা ‘রোজনামায়ে জং’য়েও আলেম-উলামা এবং দীনদার মুসলমানদের খবরাখবর বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। আমাদের দেশের তথাকথিত সেক্যুলার পত্রিকাগুলোর মতো ইচ্ছে করে দীনদার শ্রেণিটিকে ঘায়েল করা কিংবা ফোকাসের বাইরে রাখার কোনো অপচেষ্টা অন্তত দেশটির মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে নেই। এজন্য পাকিস্তানের মূলধারার গণমাধ্যমে ইসলামের একটা ছাপ লক্ষ্য করা যায়। দৈনিক জংয়ে নিয়মিত লেখেন বিশিষ্ট আলেমরা। বিশিষ্ট মুসলিম স্কলার আল্লামা তাকি উসমানির লেখাও জংয়ে প্রায়ই আসে। সেখানকার প্রখ্যাত সাংবাদিক হামিদ মিরের লেখায় প্রায়ই উঠে আসে দীনদার মুসলমানদের মনের কথাগুলো।

ইসলামি ধারার গণমাধ্যমের বিচারে পাশের দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তান আমাদের চেয়ে যথেষ্ট এগিয়ে আছে। আমাদের দেশে ইসলামি ধারার গণমাধ্যমের প্রতি একটা সচেতনতাবোধ সম্প্রতি সৃষ্টি হচ্ছে। এটা অব্যাহত থাকলে আশা করা যায় একটা সময় আমাদের দেশে ইসলামি ধারার গণমাধ্যম বিকশিত হবে। আমরা এখন সেই সোনালি দিনের অপেক্ষায়। #

লেখক: আলেম সাংবাদিক, গ্রন্থকার

সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামি লেখক ফোরাম