তীব্র শীতে উচ্ছেদ অভিযান: বিপর্যস্ত দুয়ারীপাড়ার বস্তিবাসীর জীবন

তারিক মুজিব ।।

নাস্তা করতে বেরিয়েছিলাম। শুক্রবার বা ছুটির দিনে দুয়ারীপাড়া মোড়ের একটু আগের একটি দোকান থেকে সাধরণত নাস্তা করা হতো আমার। ওই দোকানের রবিন নামের তেরো বছরের একটি পিচ্ছির সাথে ভালো খাতির জমে ওঠেছিল এই কয়মাসে। তাছাড়া মোটামুটি ভালো আয়োজনের মধ্যে দোকানটি বেশ পরিচ্ছন্ন ছিল। আজ নাস্তা করতে এসে দোকানটি আর পেলাম না।

সহকর্মী মামুনুর রশীদ দু’দিন আগেই জানিয়েছিলেন দুয়ারীপাড়ায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। আমিও গত শুক্রবারে রূপনগর থেকে ফেরার পথে উচ্ছেদ বিষয়ে কী একটা ঘোষণা যেন মাইকে প্রচার হতে শুনেছিলাম। নানাবিধ ব্যস্ততায় শুক্রবারের পর ওদিকটায় আর যাওয়া হয়ে উঠেনি। আজ গিয়ে দেখলাম দুয়ারীপাড়া যেন এক বিস্তীর্ণ পাথুরে মরুভূমি।

আজকের নাস্তা পাশের একটি ‘আলীশান হোটেল’ থেকে সেরে নিয়েছি। আমি রবিন ছেলেটিকে খুঁজছিলাম। কীর্তনখোলার ভাঙ্গনে ঘরবাড়ি হারিয়ে ওর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে দুয়ারীপাড়ার বস্তিতে বাস করছিল। নদী ভাঙ্গনে সর্বস্বান্ত হওয়ার আগে বরিশালে ওদের পরিবার নাকি বেশ বিত্তবানই ছিল। এসব রবিনের কাছে শোনা। সত্য-মিথ্যার যাচাই নেই। তবে বিশ্বাস না করার মতো অযৌক্তিকও নয়। নদী ভাঙ্গনে সর্বস্বান্ত হওয়া আমাদের দেশের সাধারণ ঘটনা।

রবিনকে পাওয়া গেলো। বাবা আর ভায়ের সাথে ইট থেকে পলেস্তারা সরাচ্ছে। ইট, টিন আর খুচরা কিছু রড বিক্রি করে দিয়ে ওরা বনানীর দিকে আরেক বস্তিতে চলে যাবে। পিচ্ছিটার জন্য কিছুটা মায়া হলো আমার। ওদের এমনই ভাসমান জীবন। দু’রুমের জীর্ণ ইটের ঘরটিতে সাতজন থাকতো ওরা। রবিনের পাশে একটি ছোট মেয়েকে দেখলাম প্রচণ্ড শীতে কাঁপছে। গত শীতে কেনা হুডিতে শীত মানছে না। আর আজ তো ঢাকার তাপমাত্রা এ বছরের সবচেয়ে কম।

কয়েকজন মহিলাকে বিলাপ করতে শুনলাম বস্তিতে নাকি তাদের নিজেদের কেনা জায়গা ছিল। কেউ সতের কেউ পনের বছর যাবত এ বস্তিতে আছে। বস্তিতে কীভাবে লিজ নিতে হয়, ছোট ছোট খুপড়ির কত কী ভাড়া; এসব আমার জানা নেই। তবে মহিলা কতকের কথাতে বেশ স্পষ্ট যে, বেশ বেকায়দায়ই পড়েছেন তারা। কতদিনের সাজানো সংসার ছিল। এখন তীব্র শীতে তারা আশ্রয়হীন। দশ মিনিট দাঁড়িয়ে নানা রকমের প্রলাপ শুনতে পেলাম।

রাস্তার পাশে এক দোকানে চা পান করতে বসে শুনলাম এলাকার ‘শিক্ষিত ব্যাচেলর’দের আলাপও উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে। উচ্ছেদের বৈধতা-অবৈধতা, প্রয়োজনীতা, বস্তিবাসীর ‘বর্বরতা’ নিয়ে নানারকম তর্ক জমে উঠেছে। বস্তির কোন্ ছেলেকে কে কবে কোথায় গণধোলাই খেতে দেখেছে এসব আলাপও রসিয়ে রসিয়ে করছে কেউ কেউ।

অবশ্য সবাই একমত যে, এই প্রচণ্ড শীতের দিনে বস্তি উচ্ছেদে অভিযান চালানো ঠিক হয়নি প্রশাসনের। শীতের মওসুমটা পার হলেও উচ্ছেদ অভিযান চালানো যেতো। তখন না হয় বস্তির ‘অসভ্য’ ছেলেগুলো কোনো আলীশান বাড়ির গেটের সামনে ইটের উপর মাথা পেতে রাতটুকু কাটিয়ে দিতে পারতো। আর দিনে হয়ে যেত লেগুনার পুরাদস্তুর হেলপার।

তবে শীত-গরমের মানবিকতার আলাপ বাদ দিয়ে পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে উচ্ছেদ অভিযান চালানোকে আমার কাছে বে-আইনি মনে হয়েছে। এই রাষ্ট্র তো মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অক্ষম অসহায় লোকদের স্বচ্ছ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতেও অঙ্গীকারবদ্ধ। তাহলে কেন বস্তির লোকদের ভাসমান জীবন? এঁদের জীবনের নিরাপত্তা-নিশ্চয়তা কোথায়?

কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে মুহাজির রোহিঙ্গাদের জন্য পুনর্বাসনকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। (সেখানে এখন পর্যন্ত কেউ যায়নি সেটা ভিন্ন আলাপ) কিন্তু নদী ভাঙ্গন, ঘুর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে বা ঘর-বাড়ি আগুনে পুড়ে যে লাখ লাখ মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছেন তাদের স্থায়ী নিবাসের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকরি কি কি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে- নিজেকে এসব প্রশ্ন করতে করতে বাসায় ফিরলাম।

পূর্ববর্তি সংবাদপ্রচণ্ড কুয়াশার কারণে বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডুবি, নিহত ১, নিখোঁজ ১০
পরবর্তি সংবাদবাড্ডা থেকে হুজিবির ৬ সদস্যকে আটক করা হয়েছে : সিটিটিসি